বৌদ্ধধর্মের শীলের গুরুত্বারোপ

  দুঃখ বিমুক্তির ভিত্তি হল শীল


ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু


দুঃখ বিমুক্তি নির্বাণের জন্য শীলই হল উত্তম মার্গ। উত্তম মার্গ এ শীল কি? সহজভাবে বলতে গেলে সদাচারই হল শীল। 


শীল কত প্রকার ও কি কি? 


শীলের অনেক প্রকারভেদ থাকলেও মোটামুটি ভাবে শীলকে এভাবে বিন্যাস করা যায়। যেমন- পঞ্চশীল, অষ্টশীল, দশশীল, ২২৭ শীল এবং ৩১১ শীল। 


পঞ্চশীল হল সাধারণ গৃহস্থ উপাসক-উপাসিকাদের দৈনন্দিন জীবনে অনুশীলন করার জন্য। অর্থাৎ এ পঞ্চশীল হল সর্ব সাধারণের জন্য নিত্য প্রতিপাল্য শীল। 


অষ্টশীল হল পূর্ণিমা, অমাবশ্যা, অষ্টমী প্রভৃতি বিশেষ বিশেষ দিন সমূহে উপাসক-উপাসিকাগণের প্রতিপাল্য শীল। 


দশশীল হল প্রব্রজ্যিত বা শিক্ষা নবীশ বা শ্রামণ-শ্রামণীদের এবং অনাগারিক-অনাগারিকাদের জন্য প্রতিপাল্য শীল। 


২২৭ শীল হল উপসম্পন্ন ভিক্ষুদের জন্য আজীবন প্রতিপাল্য বা অনুসৃত শীল। 


৩১১ শীল হল উপসম্পন্ন ভিক্ষুণীদের জন্য আজীবন অনুসরণীয় ও প্রতিপাল্য শীল।


সংযুক্ত নিকায়ের দেবতা সংযুক্তে উল্লিখিত হয়েছে যে, এক সময় ভগবান বুদ্ধ শ্রাবস্তীর জেতবন বিহারে বিহার করছিলেন। সে সময়ে কোন দেবপুত্র গভীর রাতে ভগবানের নিকট উপস্থিত হয়ে ভগবানকে অভিবাদন করে একান্তে স্থিত হয়ে নিজের সন্দেহ নিরসনার্থে জিজ্ঞাসা করেছিলেন-


‘অন্তো জটা বহি জটা জটায জটিতা পজা।

তং তং গোতম! পুচ্ছামি কো ইমং বিজটযে জটন্তি।’


অর্থাৎ ভিতরের জটা, বাহিরের জটা অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক বন্ধন দ্বারা প্রাণীকূল আবদ্ধ বা বন্দী হয়ে রয়েছে। এজন্য হে গৌতম! আপনাকে জিজ্ঞাসা করছি যে, এ জটা সমূহ কারা কাটতে বা ছিন্ন করতে সক্ষম হয়? 


এর উত্তরে ভগবান সম্যক সম্বুদ্ধ বলেছেন-


‘সীলে পতিট্ঠায নরো সপঞ্ঞো, 

চিত্তং পঞ্ঞঞ্চ ভাবযং।

আতাপী নিপকো ভিক্খু ,

সো ইমং বিজটযে জটংতি।’


অর্থাৎ যে মনুষ্য হল প্রজ্ঞাবান, বীর্যবান, পণ্ডিত ও ভিক্ষু, যিনি শীলের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছেন, যিনি সমাধি এবং প্রজ্ঞার ভাবনা করে থাকেন, তিনিই এরূপ জটাকে কাটতে বা ছিন্ন করতে সক্ষম হন। 


বিখ্যাত যৌক্তিক আলোচনার সংগ্রহ মূলক ‘মিলিন্দ প্রশ্ন’ নামক গ্রন্থে অরহত ভদন্ত নাগসেন স্থবির বলেছেন যে- 


‘শীলের পরিচয় হল ‘আধার বা ভিত্তি হওয়া।’ ইন্দ্রিয়, বল, বোধ্যঙ্গ, মার্গ, স্মৃতিপ্রস্থান, সম্যক প্রধান, ঋদ্ধিপাদ, ধ্যান, বিমোক্ষ, সমাধি এবং সমাপত্তি ইত্যাদির উত্তম আধার বা ভিত্তি হল শীল। 


ভদন্ত নাগসেন স্থবির মহারাজ মিলিন্দকে বললেন-‘মহারাজ! শীলের উপর স্থিত হয়েই উত্তম ধর্মকে আয়ত্ব করতে হয়।’


যেরকম জীব এবং উদ্ভিদ, গাছ-পালা সবার আধার বা ভিত্তি হল পৃথিবী বা মাটি। পৃথিবী বা মাটির উপর ভিত্তি করে সব জন্মে থাকে এবং বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। অনুরূপভাবে সাধক-সাধিকা বা যোগীগণ শীলের উপর আধার বা ভিত্তি করে এবং শীলের উপর দৃঢ় হয়েই নিম্নোল্লিখিত ইন্দ্রিয় সমূহ ভাবনা করে থাকেন। যেমন-


১) শ্রদ্ধেন্দ্রিয়

২) বীর্যেন্দ্রিয়

৩) সমাধিন্দ্রিয়

৪) প্রজ্ঞেন্দ্রিয় ইত্যাদি। 


জ্ঞানী মনুষ্য শীলের উপর দৃঢ়তা সহকারে ভর করে স্বীয় চিত্তকে ভাবনা দ্বারা বশীভূত করে থাকেন। শীলকে আধার বানিয়ে সংযমী ও বুদ্ধিমান মনুষ্য তৃষ্ণারূপী জটাকে কেটে পরিস্কার করতে সক্ষম হয়ে থাকেন। 


পৃথিবীর বা মাটির মত শীল হল মুক্তি অভিলাষী লোকদের আধার এবং কুশল এবং অভিবৃদ্ধির জন্য শীল হল মূল ভিত্তি।


শরীরকে বাহ্যিকভাবে ধৌত করে পরিস্কার করার জন্য সাবান, সেম্পু, সুগন্ধি দ্রব্য বা তেল প্রভৃতি ব্যবহার করা হয়। বাহ্যিক শরীরকে পরিচ্ছন্ন করার চেয়েও অধিক প্রয়োজন হল চিত্ত বা মনকে পরিশুদ্ধ করা। যা শীল পালনের মাধ্যমে নিরন্তর বিদর্শন ভাবনা অনুশীলনেই সম্ভব হয়। বিদর্শন ভাবনা অনুশীলন করে সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার জন্য শীল পালন অবশ্য কর্তব্য। শীল পালন ব্যতীত সমাধি ও প্রজ্ঞা অনুশীলন অর্থাৎ বিদর্শন ভাবনায় সমৃদ্ধি কখনও সম্ভব নয়। 


অঙ্গুত্তর নিকায়ের শ্রামণ সূত্রে বুদ্ধ তথাগত নির্বাণকামী শ্রামণেরগণের তিনটি কর্তব্যের সম্পর্কে বলেছেন। সে তিন প্রকার কর্তব্য কি কি? 


প্রথমত হল শ্রেষ্ঠতর শীল পালন করা। যাঁদের যে শীল নির্ধারণ করা হয়েছে, তাঁদেরকে সে সমস্ত শীল নিখুঁতভাবে পালন করতে হবে। 


দ্বিতীয় হল ধ্যান সমাধির মাধ্যমে চিত্তের শ্রেষ্ঠতর সংযমতা শিক্ষা করা।


তৃতীয় হল বিদর্শন ভাবনা অনুশীলন করে শ্রেষ্ঠ প্রজ্ঞা জাগ্রত করা। প্রত্যেকের জন্য কর্তব্য হল এ তিনটি। এজন্য দুঃখ মুক্তিকামী ভিক্ষু-ভিক্ষুণী ও সাধক-সাধিকাদের শিক্ষা করা উচিত যে, শ্রেষ্ঠতর শীল পালনের জন্য তীব্র প্রয়াস করা। শ্রেষ্ঠতর চিত্ত দমনের অনুশীলন করা এবং শ্রেষ্ঠতর প্রজ্ঞার জন্য নিষ্ঠা সহকারে বিদর্শন ভাবনা অনুশীলন করা অবশ্যাম্ভাবী। 


বর্তমানে চারিদিকে অবস্থা দৃষ্টে মনে হয়, কি গৃহত্যাগী, কি গৃহস্থ অধিকাংশেরই শীল পালনের প্রতি শিথিলতা বা অনীহা রয়েছে। বিশেষ করে ভিক্ষুরা নির্বাণ সাক্ষাতের প্রতিজ্ঞা বা সঙ্কল্প করে চীবর পরিধান করলেও অধিকাংশই কাজ করছেন সংসার চক্রে আবদ্ধ থাকার। অনেক ভিক্ষু বর্তমানে ঝার-ফুঁক, তাবিজ-কবচ ইত্যাদি বৈদ্যালীর মত বুদ্ধ নিন্দিত কুহক বিদ্যার সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে। অধর্ম-অবিনয়ী জীবন যাপনের মাধ্যমে মিথ্যা জীবিকা অবলম্বন করে অর্থ উপার্জনের  

দিকে ঝুঁকে পড়ছে। অনেকে নানা রকম পদ্ধতিতে অর্থ লগ্নি করে মুনাফা অর্জন করছে। চাকরী ও অনাথালয়াদির নামে অর্থ সংগ্রহ করে দুঃশীল, অবিনয়ী ও বিলাসী জীবন-যাপনে অভ্যস্থ হয়ে পড়েছে। মামলা-মোকদ্দমমার সাথে জড়িত হয়েও অনেকে অমৈত্রী, অসংযত ও বিদ্বেষ চিত্তে জীবন-যাপন অনেকে করছে। এর চেয়েও অতীব আশ্চর্য হওয়ার বিষয় যে, সমাজের দুঃশীল ও সদ্ধর্ম শিক্ষায় অনভিজ্ঞ ভিক্ষু ও সাধারণ লোকেরা এ সকল অবিনয়ী ভিক্ষুদেরকে ভরপুর পৃষ্টপোষকতা করে যাচ্ছে। তারা মানবতার কাজ করছে বলে তাদেরকে বাহবা দিচ্ছে। যে কর্মের জন্য বাহবা পাচ্ছে, সেগুলি কোন মতেই ভিক্ষোচিত কাজ নয়। বুদ্ধ নিন্দিত সে সমস্ত অবিনয়ী ও দুঃশীল কাজ করতে হলে গৃহস্থ হয়ে করতে পারে। আপত্তি কোথায়! এ সমস্ত বিষয় অবলোকন করে সহজে দেখা যায় যে, আমরা শ্রমণ কর্তব্য পালনে কত দূরে রয়েছি। নির্বাণ তো দূরের কথা, ভিক্ষুর জন্য সুগতি লাভের কাজও সেগুলি নয়।

Comments

Popular Posts