24/12/023

 মূর্তিকে নয়, বিচার ও আদর্শকে অনুসরণ করুন


ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু


ভগবান সর্বজ্ঞ সর্বদর্শী বুদ্ধ তাঁর অনুসারীদেরকে কখনো মূর্তি তৈরী করতে বা মূর্তির পূজা করতে উৎসাহিত করেননি। তিনি তাঁর বিচার ও আদর্শকে অনুকরণ ও পূজা করতে বলেছেন। কেননা মূর্তির মত জড় বস্তু পূজার দ্বারা কখনো ক্রান্তি আসেনা। ক্রান্তি কেবল বিচার এবং আদর্শ হতেই আসে। এজন্য মূর্তির পূজা করার পরিবর্তে  সকলকে উচিত বৈচারিক ও আদর্শবান হওয়া। 


বর্তমানে আমাদের সমাজে মূর্তি পূজার প্রতি মানুষের যে প্রবল আগ্রহ, যে বিশ্বাস, যে আস্থা ও যে উৎসাহ দেখা যাচ্ছে সেরকম উৎসাহ ও প্রচেষ্টা বিচার, গুণ ও আদর্শ অনুশীলনের চিটেফোটাও দেখা যায়না। মূর্তির সামনে নত মস্তক হওয়া, মূর্তির সামনে গিয়ে থালা সাজিয়ে নৈবেদ্য অর্পণ করা, ধূপ-দীপ জ্বালানো ইত্যাদিকেই ধার্মিকতার মাপকাঠি মনে করা হচ্ছে। নীতি-আদর্শ-শীল-ধ্যান ও আত্ম সংযম অনুশীলনের কোনো বালাই নেই। এক শ্রেণীর ধম্ম ব্যবসায়ীও খুব উৎসাহ দিচ্ছে মূর্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এবং মূর্তি পূজার জন্য। যেখানে একটি মূর্তি হলেই যথেষ্ট, সেখানে নানা রকমের ছোট-বড় অনেক মূর্তি। আরও প্রতিযোগিতা চলছে কার চেয়ে কে বড় মূর্তি বানিয়ে লোকের ভীড় আকৃষ্ট করতে পারে। এক এক এক মূর্তির এক এক অদ্ভুত মহিমা কীর্তন করা হচ্ছে। কোনোটা জাগ্রত, কোনোটা সত্য, কোনোটা পাগলা, কোনোটা জঙ্গলী, কোনোটা কালো, কোনোটা বুড়া ইত্যাদি নামের কত যে যাদু শক্তি! বুদ্ধকে আমরা বুদ্ধ রাখিনি। আমরা বুদ্ধকে বর দেওয়ার গোঁসাই বানিয়ে নিয়েছি। গোঁসাই মানে হল দেবী-দেবতা। গোঁসাই বা গোঁয়াই নাম দিয়ে বুদ্ধকে আমরা পূজা করছি দেবী-দেবতারূপে। কতই না আমাদের অজ্ঞতা! ইহা কতই না হাঁস্যকর! এখন বিহার সমূহ এবং এমনকি লোকের ঘর সমূহেও বিভিন্ন বুদ্ধ সহ তাঁর ঋদ্ধিমন্ত শিষ্য ও নিজেদের গুরুদের হরেক রকমের মূর্তি ও ছবিতে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে। এ সমস্ত মূর্তি ছবির প্রভাব ও ঋদ্ধি এত বেশী বলে ধর্ম ব্যবসায়ীরা প্রচার করছে যে, সেগুলি রাখলে বা  পূজা করলে বুলেট প্রুফের মত সুরক্ষা পাওয়া যাবে, রাজা-মহারাজার মত অর্থ-বিত্ত লাভ করে সুখ ভোগ করা যাবে, যাদুর ছোঁয়ার মত মনের সব চাহিদা আশা পূর্ণ হয়ে যাবে এবং স্বর্গের নিশ্চিত টিকিটও পাওয়া যাবে-ইত্যাদি আরও কত কি! এজন্য লোকের মধ্যে কষ্ট করে এখন নীতি-আদর্শ অনুশীলনের কোনো বালাই নেই। কেবল মূর্তি তৈরী করো আর পূজা করো। সস্তায় সবকিছু করায়ত্ব করো। ইহাই মুখ্য ধেয়্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। 


আমি মূর্তি বা মূর্তির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের বিরোধী নই। কিন্তু আমরা যেহারে দিন দিন মূর্তিময় হয়ে যাচ্ছি বা মূর্তি সর্বস্ব হয়ে যাচ্ছি বা মূর্তি নির্ভর হয়ে যাচ্ছি এর তীব্র বিরোধিতা করছি। কেন আমি তা অপছন্দ করছি সে প্রসঙ্গে এখানে একটি কাহিনীর অবতারণা করছি। কাহিনীটি হল নিম্নরূপ-


এক রাজা ছিলেন। তিনি ছিলেন মূর্তি পূজার কঠোর বিরোধী। একদিন এক ব্যক্তি তাঁর রাজদরবারে এসেছিলেন এবং বললেন-‘হে রাজন! আপনি মূর্তি পূজার বিরোধ করেন কেন?’


রাজা বললেন-‘মূর্তি পূজা যে সঠিক তা তুমি প্রমাণ করে দেখাতে পারলে, তখন তা আমি মেনে নেব।’


ব্যক্তি বললেন-‘রাজন! যদি আপনি মূর্তি পূজায় বিশ্বাস না করেন, তাহলে চৌমাথায় যে আপনার প্রয়াত পিতার মূর্তিস্থাপন করা হয়েছে, সে মূর্তির উপর থুথু নিক্ষেপ করতে পারবেন কি? যদি আপনি থু থু নিক্ষেপ করতে পারেন, তাহলে আমি আজকেই মূর্তি পূজা ত্যাগ করব। আর যদি আপনি নিক্ষেপ করতে না পারেন, তাহলে আজ হতেই আপনি মূর্তি পূজা করতে শুরু করুন।’


ইহা শুনে রাজ দরবারের সবাই হতচকিত হয়ে মুখ বন্ধ হলে তথায় নীরবতার ছায়া নেমে আসল। 


কিছুক্ষণ পর রাজা নীরবতা ভঙ্গ করে বললেন-‘ঠিক আছে, এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য তুমি আমাকে সাতদিন সময় দাও। এরপর আমি জবাব দেব।’


তখন সে ব্যক্তি রাজদরবার ত্যাগ করে চলে আসলেন। কিন্তু চলে আসার পর চতুর্থ দিনে সে ব্যক্তি হন্যে হয়ে দৌঁড়তে দৌঁড়তে রাজ সভায় এসে পৌঁছলেন এবং হাঁপাতে হাঁপাতে চিৎকার করে কান্না করতে করতে রাজাকে বললেন-‘রাজন! আমার সর্বনাশ হয়েছে, রাজন! আমার সর্বনাশ হয়েছে।’


রাজা বললেন-‘কি সর্বনাশ হয়েছে?’


ব্যক্তি বললেন-‘রাজন! কিছু দুষ্কৃতিকারী আমার মাতা-পিতাকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছে এবং আমার ঘরে তাঁদের দু’টি মূর্তি রেখে গিয়েছে।’


রাজা বললেন-‘হাঁ, আমিই তোমার মাতা-পিতার মূর্তি বানিয়ে তোমার ঘরে রাখার ব্যবস্থা করেছি। এখন তোমার মাতা-পিতা বন্দী অবস্থায় আমার এখানে থাকবে এবং তাঁদেরকে কোনো পানাহারও দেওয়া হবেনা। কিন্তু তুমি ঘরে গিয়ে সে মূর্তিদ্বয়ের সামনে ভালমতে খাবার দাও, মূর্তিকে সেবা করো। সে মূর্তি দু’টোকে ভাল খাদ্য দাও, মূর্তিকে উত্তম বস্ত্র পরিধান করাও, সুগন্ধি জলে স্নান করাও এবং সুন্দরভাবে আরাম-আয়েসে শয়নের সকল ব্যবস্থা  করো।’


ব্যক্তি বললেন-‘রাজন! সে মূর্তি তো নির্জীব ও জড় বস্তু। কিভাবে মূর্তি সেগুলি পরিভোগ করবে এবং মূর্তি সমূহকে পানাহার দিলে, তা আমার মাতা-পিতার পেটে কিভাবে যাবে? আমার মাতা-পিতা তো ক্ষুধা ও অনাহারে মারা যাবে। আপনি তাঁদের মুক্তি দেওয়ার কোনো উপায় তো করুন, মহারাজ!’


রাজা বললেন-‘ঠিক আছে। তুমি এ দশ হাজার সুবর্ণ মুদ্রা নিয়ে যাও এবং সে মূর্তি দু’টোর সম্মানে সেগুলি রাখার জন্য একটি সুন্দর ও মজবুত ভবন তৈরী করো।’


ব্যক্তি বললেন-‘রাজন! আমার মাতা-পিতা বন্দীগৃহে থাকবেন এবং আমি তাঁদের মূর্তি দু’টোকে মনোরম ভবনে রেখে সেবা করব? ইহা মহামুর্খতা নয় কি?’


রাজা বললেন-‘তোমার মাতা-পিতার মূর্তিদ্বয়কে সেবার দ্বারা তোমার সত্যিকার মাতা-পিতার সেবা হয় কিনা তাই আমি এখন দেখতে চাচ্ছি।’


ব্যক্তি তখন অকপটে করজোরে স্বীকার করলেন-‘রাজন! সে মূর্তিদ্বয়ের সেবার দ্বারা মাতা-পিতার সেবা-পূজা কখনও হবেনা।’


রাজা বললেন-‘যখন তুমি আরাধ্য ভগবানের মূর্তি বানিয়ে খাদ্যাদি দিয়ে পূজা করতে পারো এবং সেভাবে পূজাকে সর্বব্যাপক ভগবানের পূজা হয় বলে মনে করছো, তাহলে সেভাবে মাতা-পিতার সেবা কেন হবেনা?’


এখন ব্যক্তিটির বাকরুদ্ধ হল। তাঁর দৃষ্টি ও মস্তক নীচ হল। 


রাজা পুণরায় বললেন-‘তোমার মাতা-পিতার মধ্যে যে সদ্গুণ বিদ্যমান রয়েছে, যেমন, আদর, মমতা, স্নেহ, ভালবাসা, বাৎসল্য, জ্ঞান, বিবেক, মার্গ দর্শন, সুরক্ষাভাবনা, ত্যাগ, সৎ চেতনা ইত্যাদি বানানো মূর্তির মধ্যে কোথাও বিদ্যমান নাই। অনুরূপভাবে মূর্তির মধ্যেও ভগবান, সর্বজ্ঞ, সর্বদর্শীর অন্তর্যামীর দয়া, করুণা, ন্যায়, প্রজ্ঞা, চেতনা কিছুই বিদ্যমান থাকেনা। সুতরাং এরকম মূর্তির প্রতি মগ্ন হওয়ায় কোনো লাভ নাই।’


এরপর রাজদরবার কিছু সময়ের জন্য শান্ত ও নীরব হল। 


ব্যক্তি বললেন-‘আমাকে ক্ষমা করুন, রাজন! আপনি আমার চক্ষু খুলে দিয়েছেন। আমার ভুল এখন আমি দেখতে পাচ্ছি। এখন এরকম ভুল আমি আর দ্বিতীয়বার করবনা।’


অন্তিমে রাজা বললেন-‘হাঁ, আমরা নিজেদের বস্ত্রাভূষণ সমূহ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রেখে সেগুলিকে ময়লা-নোংরা হতে দিইনা, সেগুলিকে সম্মান ও যত্ন করে রক্ষা করি, ঠিক তেমনিভাবে স্মরণ করার জন্য নিজেদের ইষ্ট, পূর্বজ মহাপুরুষদের ছবি, মূর্তিকে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখতে পারি এবং সেগুলি নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখা হল আমাদের দায়িত্ব এবং কর্তব্য। যাও, তুমি তোমার মাতা-পিতাকে নিয়ে গিয়ে ঘরে শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে সেবা করো।’


উপরের কাহিনী দ্বারা ইহাই বলতে চাই যে, বুদ্ধের যে শীল সেগুলি অনুশীলন, বুদ্ধের যে ত্যাগ, সত্যবাদিতা, ক্ষমাশীলতা, সংযমতা সেগুলির অনুশীলনই বেশী করে করতে হবে এবং অন্যের উপর নির্ভরশীল ও প্রার্থনা নির্ভয় না হয়ে ধ্যান-সমাধির মাধ্যমে অর্জিত বুদ্ধের যে প্রজ্ঞা সে রকম প্রজ্ঞার উৎকর্ষ সাধনের জন্য নিরন্তর প্রয়াসরত থাকাই হল প্রকৃত বুদ্ধ পূজা, প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন, প্রকৃত লাভ এবং প্রকৃত সুরক্ষা। তাতেই বেশী পরিবার, সমাজ, দেশ তথা বিশ্বের কল্যাণ ও ক্রান্তি আসবে। অন্যথায় সম্ভব নয়। কোনো মহাপুরুষকে সম্মান করুন তাঁর গুণাদর্শ অনুশীলন করে, কিন্তু তিনি পার করিয়ে দেবেন সেরকম অন্ধবিশ্বাস, ভণ্ডামির ফাঁদের পড়ে নয়। বর্তমানে সর্বত্র ধর্ম ব্যবসায়ীদের দ্বারা অন্ধ ভক্তিকেই বেশী প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

Comments