অনলাইন জরিপ
☸️ মেডিটেশন যেভাবে বদলে দিয়েছিল স্টিভ জবসের জীবন
✍️ শাহাদাত হোসেন
স্টিভ জবসের বয়স তখন মাত্র ১৯ বছর। রীড কলেজ থেকে ড্রপআউট এই কিশোর চলে গেলেন ভারতে। তবে ভারত থেকে যখন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরলেন, তখন তাকে দেখে সবাই চমকে গেল। সান ফ্রান্সিসকো বিমান বন্দরে অবতরণের পর তার বাবা মা তাকে দেখে চিনতে পারলেন না।
ভারতে তিনি এসেছিলেন মূলত আধ্যাত্মিক জীবনের খোঁজে। ভারতীয় উপমহাদেশের হিন্দু ধর্মগুরু কিংবা বৌদ্ধ ধর্মের আধ্যাত্মিক সাধকদের কথা তিনি আগেই শুনেছিলেন। তবে তিনি নিজেও হয়তো কখনও চিন্তা করতে পারেননি তার এই ভারত সফরই পুরো জীবনকে পালটে দেবে। শুধু তার নিজের জীবনই নয়, পালটে দেবে প্রযুক্তি বিশ্বকেও।
ভারত থেকেই শুরু হলো তার আধ্যাত্মিক সাধনার। পরবর্তীতে তিনি যখন নিজ দেশে ফিরে যান, তখনও তার এই সাধনা অব্যাহত ছিল। ১৯৭০ সালের সে সময়টাতে যুক্তরাষ্ট্রেও জেন মেডিটেশন ডালপালা মেলতে শুরু করে। তার সাথে তখন দেখা হলো শুনর্যু সুজুকি নামের এক লেখকের যার বিখ্যাত একটি বই ‘জেন মাইন্ড, বিগিনারস মাইন্ড’। স্টিভ জবস তার কাছে জেন মেডিটেশন শেখার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। গুরু হিসেবে পেতে চাইলেন সুজুকির এক শিষ্য কোবান অতোগাওয়াকে।
জবসকে নিয়ে লেখা জীবনীতে ওয়াল্টার আইজাকসন জানান, জবস প্রায় প্রতিদিনই অতোগাওয়ার সাথে দেখা করতেন। আর কয়েক মাস পরপরই তারা দুজন মিলে ধ্যান করতে চলে যেতেন।
বৌদ্ধ ধর্ম এবং এই ধর্মের আলোকে ধ্যান করার মাধ্যমে জবস তার নিজের মানসিক চিন্তাধারাকে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চালনা করতে শিখেছিলেন যা তার জীবনযাত্রা পরিবর্তনের পেছনে মূল ভূমিকা পালন করে।
আইজাকসনকে স্টিভ জবস বলেন, “আপনি যদি একটা জায়গায় স্থির বসে থাকেন, তাহলে দেখতে পাবেন আপনি মন কতো অস্থির এবং ছটফট করে।” তিনি আরও বলেন, “আপনি যদি মনকে শান্ত করতে চান, তাহলে দেখা যাবে ভালোর পরিবর্তে আরও খারাপ হচ্ছে। তবে সময়ের সাথে সাথে একসময় ঠিকই আপনার মন মানসিকতা একটা জায়গায় এসে স্থির হবে। আর সে সময় আপনি অনেক সূক্ষ্ম বিষয় নিয়েও চিন্তা করতে পারবেন, আপনার অনুমান জ্ঞান আরও প্রখর হবে, আপনি কোন কিছু নিয়ে আরও গভীরভাবে অনুমান করতে পারবেন।”
জবস আরও বলেন, “আপনার মনে হবে সময় অনেক ধীরগতির হয়ে গেছে, প্রতিটি মুহূর্ত আপনার কাছে অনেক দীর্ঘ মনে হবে। আপনি আগে যা দেখতে পেতেন, তার থেকে অনেক বেশি দেখতে পাবেন। এটা একটা শৃঙ্খল জীবন, আপনাকে এর অনুশীলন করতে হবে।”
মজার ব্যাপার হলো জেন মেডিটেশন জবসকে এতোটাই নাড়া দিয়েছিল যে তিনি আরও গভীরভাবে পুরো বিষয়টিকে আয়ত্ব করতে জাপান যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে এই সিদ্ধান্তে বাধ সাধেন তার গুরু অতোগাওয়া। তিনি জবসকে বলেন তার এখানেই অনেক কাজ করার আছে। অতোগাওয়া ছিলেন একজন দূরদর্শী ব্যক্তি।
জবসের কর্মজীবনের দিকে লক্ষ্য করলে খুব সহজেই জেন মেডিটেশনের প্রভাব বোঝা যায়। ১৩০০ বছর ধরে জেন মেডিটেশন মানুষকে শিখিয়েছে কিভাবে সাহস করে কোন কাজ করতে হয়, কোন কাজে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হতে হয় এবং কঠোর হতে হয়। তবে এর সাথে এটাও শিখিয়েছে কিভাবে সাধারণ জীবনযাপন করতে হয়।
স্টিভ জবস কিংবা অ্যাপল, যেদিকেই আপনি তাকাবেন, সেদিকেই এই বিষয়গুলো দেখতে পাবেন।
আপনি যদি অ্যাপলের এই মাউসগুলোর দিকে লক্ষ্য করেন, তাহলে দেখবেন শুরুটা হয়েছে যেখান থেকে, সেই মাউসটি জেন ভিজ্যুয়াল আর্টের কতো কাছাকাছি।
তবে জবস শুধুমাত্র অ্যাপল পণ্যে নান্দনিকতার ছাপই স্থাপন করেননি, তিনি গ্রাহকদের চাহিদা তৈরিতে সম্পূর্ণ নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। তিনি খুব গর্ব করেই বলতেন, তার কাজ এটা ছিল না যে গ্রাহকরা যা চায় তা তাদের সামনে তুলে ধরা। বরং তার কাজ ছিল তাদের সামনে এমন কিছু তুলে ধরা যা তাদের দরকার ছিল কিন্তু তারা নিজেরাও তা জানতো না।
স্টিভ জবসের মৃত্যুর পর নিউ ইয়র্ক টাইমস তাকে নিয়ে একটি বিশেষ উক্তি ব্যবহার করেছিল। সেটি ছিল, “এক কুশ্রী প্রযুক্তি বিশ্ব আপনার ছোঁয়ায় হয়ে উঠল অপরূপ।”
Comments
Post a Comment