পেষ্ট ৫/০৮/২০২২

 প্রকৃতির অটুট নিয়ম


ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু


প্রকৃতির প্রথম নিয়ম হল যে, যদি কেহ ক্ষেত বা জমির মধ্যে চাষ না করে বা বীজ না বুনে, তাহলে প্রকৃতি অর্থাৎ Nature সেখানে ঘাস বা আগাছায় ভরে দেবে। তা খালি রাখবেনা। 


অনুরূপভাবে যদি আমরা মস্তিস্ককে সকারাত্মক বিচার দ্বারা ভর্তি না করি, তাহলে সেখানে নকারাত্মক বিচার এসে মস্তিস্কে স্থান করে নেয়। বর্তমান সময়ে নিজেকে Pseudo Rationalist বা ছদ্ম যুক্তিবাদী পরিচয়কারী ব্যক্তিগণ নকারাত্মক বিচারে প্রভাবিত হয়ে বিনম্রতা ও শিষ্টাচারের কোন রকমের ধার ধারেনা। তারা জেষ্ঠ্য বা সম্মানিত ব্যক্তির সামনে করজোড় যেমন করেনা, তেমনি নতমস্তকও হয়না। অপরকে সম্মান দেওয়ার সময় তাদের মনে নকারাত্মক শক্তি ভরে উঠে। শীলবান যাঁরা, তাঁরা ধর্মকে ধারণ করেন এবং দুঃশীল যাঁরা তারা দুর্ভাবনা গ্রস্ত হয়ে থাকে।


প্রকৃতির দ্বিতীয় অটুট নিয়ম হল যে, যার কাছে যা থাকে, তারা তাহাই বিতরণ করে। যেমন-


১) মিত্র সবসময় মৈত্রী বিতরণ করে।

২) দ্বেষী দ্বেষ বিতরণ করে। 

৩) সুখী সুখ বিতরণ করে।

৪) দুঃখী দুঃখ বিতরণ করে।

৫) জ্ঞানী জ্ঞান বিতরণ করে।

৬) মুর্খ মুর্খতা বিতরণ করে।

৭) ভ্রমিত ভ্রম বিতরণ করে। 


যে নিজেই ভীরু বা ভয়ভীত সে অন্যদেরকেও ভয় দেখিয়ে দাবিয়ে রাখে। 


যে সাহসী সে অন্যদেরকেও সাহস দেখিয়ে উৎসাহিত করে।


ঠিক অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি নিজেই সফলতা (Successful) অর্জন করে, সে অন্যদেরকেও সফলতার মার্গ দেখায়। 


অর্থাৎ যার নিকট যা থাকে, সে তাহাই অন্যদের বন্টন করে থাকে।


প্রকৃতির এসব অটুট নিয়ম সকলের উপর লাগু হয়ে থাকে। প্রকৃতির নিয়মে কারও উপর কোন ভেদ-বৈষম্য করেনা। যেরকম বীজ বপন করবে, সেরকমই ফল পেয়ে থাকে। 


স্বর্গ-নরক সব নিজের মধ্যেই

————————————-


মনুষ্য যখন যখন ক্রোধ উৎপন্ন করে থাকে, দ্বেষ বা দুর্ভাবনা উৎপন্ন করে থাকে, তখন তারা নরকের অগ্নিতে জ্বলতে থাকে। চেহারায়ও ক্রোধিত আসুরিক বিভৎসরূপ ফুটে উঠে এবং যখন যখন মানুষ মৈত্রী বা নিঃস্বার্থ ভালবাসা উৎপন্ন করে থাকে, সদ্ভাবনা উৎপন্ন করে থাকে, তখন মনে স্বর্গ সুখ ভোগ করতে থাকে। চোখে মুখেও দিব্য অবয়ব ফুটে উঠে। আপনি নিজেকে নিজে নরকও তৈরী করছেন এবং আপনি নিজেকে নিজে স্বর্গও বানাচ্ছেন। 


সুতরাং, নরক হতে বাঁচুন এবং স্বর্গ তৈরী করুন।


যদি ভ্রম বা ভ্রান্তি বশতঃ ভুল হয়ে যায় কি করা উচিত?

———————————-


ভুল হলে তা কখনও লুকানো বা ঢাকা উচিত নয়। যদি ভুল ঢাকার চেষ্টা করা হয়, তাহলে তা অবশ্যই পুনরায় করবে। অর্থাৎ একই ভুল বার বার করার প্রবৃত্তি জাগবে। তা এক অন্তহীন প্রক্রিয়া হতে থাকবে।


যদি আপনি স্বীয় জেষ্ঠ্য বা সম্মানিত ব্যক্তির সামনে নিজের অপরাধ স্বীকার বা প্রকাশ করেন এবং ইহাও প্রতিজ্ঞা করেন যে, কোনও পরিস্থিতিতে এরকম ভুল ভবিষ্যতে আর করবনা। তখন আপনি দেখবেন যে, আপনার মন শক্তিশালী হতে থাকবে। ইহাই ভগবান বুদ্ধ শিক্ষা দিয়েছেন। 


যখন আপনি নিজের খারাপ কর্মকে পর্দা দ্বারা ঢেকে রাখবেননা, তখন সে মন্দ কর্ম আপনার দ্বারা আর হবেনা।


বাচ্চাদেরকে কিভাবে ধর্ম ও শিষ্টাচার শিখাবেন?

——————————


বাচ্চাদেরকে ধর্ম শিক্ষা দেওয়ার সবচেয়ে ভাল সময় হল ভূমিষ্ট হওয়ার পূর্বে। অর্থাৎ গর্ভাবস্থায় (Pregnancy) প্রত্যেক মাকে বিদর্শন ভাবনা অনুশীলন করা উচিত। সে সময় মা বিদর্শন ভাবনা অনুশীলন করলে তা বাচ্চাও গ্রহণ করে থাকে এবং এক ধম্মশিশুরূপে সে ধরাধামে অবতীর্ণ হবে।


যখন বাচ্চা জন্ম গ্রহণ করে তাকে আপনি শৈশব কাল হতে ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান দিতে পারেন। শিষ্টাচার সম্পর্কে জ্ঞান দিতে পারেন। সম্মানিত ও গুরুজনদেরকে সম্মান দিতে এবং তাঁদের সাথে শালীনতা ও নম্রভাবে কথা বলতে শিক্ষা দিতে পারেন। 


নিজে রোজ ধ্যান ভাবনার অন্তে এবং ঘুমাবার সময় বাচ্চাকে মৈত্রী বিতরণ করুন। ধীরে ধীরে সে যতই বড় হয়ে উঠবে, তাকে কয়েক মিনিট আনাপান স্মৃতি অভ্যাস করতে শিক্ষা দিন। কোনভাবে বাচ্চাকে জোর জবরদস্তি করবেননা। মৈত্রী দিয়ে, আদর স্নেহ দিয়ে শিক্ষা দিন। নিজের সাথে বসিয়ে কয়েক মিনিটের জন্য শ্বাস-প্রশ্বাসের আসা-যাওয়ার উপর স্মৃতি অনুশীলন করান। অতঃপর তাকে খেলতে দিন। তখন তার কাছে ধ্যান করাও এক খেলার মতই হবে। এভাবে করলে সে আনন্দ লাভ করবে। 


সবচেয়ে মহত্বপূর্ণ কথা হল যে, আপনাদেরকে এক পবিত্র ধর্ম জীবন-যাপন করতে হবে এবং তা হবে বাচ্চাদের জন্য এক আদর্শ উদাহরণ। 


নিজের ঘরে সবসময় আপনাদেরকে আনন্দপূর্ণ এবং শান্ত পরিবেশ তৈরী করতে হবে। যা বাচ্চাকে স্বাস্হ্য ও সুখী সন্তানরূপে বড় হতে সহায়তা করবে। বাচ্চার জন্য ইহাই হবে আপনাদের সবচেয়ে বড় উপহার।


মনে যে সমস্ত ভাল-মন্দ বিচার এসে থাকে, সেগুলি বাণী এবং কর্ম কায় দ্বারা প্রকট না করলেও কি কর্ম-সংস্কার তৈরী করে?

—————————


আমাদের মনে ভাল চিন্তা বা বিচারও আসে এবং মন্দ বা খারাপ বিচারও এসে থাকে।


ভাল বিচার আসলে সেগুলি কায় বা বাণী দ্বারা ভাল কর্ম করা হয়েছে, তখন এরূপ বিচার কায় ও বাণী দ্বারা প্রকট হয়েছে। তাতে নিজেরও মঙ্গল হয় এবং অন্যদেরও মঙ্গল হয়। 


আপনার মনে অনেক মন্দ বিচারও আসতে থাকে। দূষিত ময়লা বিচার আসল এবং সেগুলি আপনি বাণীতেও প্রকট করেননি এবং কায়ের মাধ্যমেও প্রকট করেননি। সেজন্য আপনি অন্য কারও অবশ্যই হানি বা লোকসান করেননি। কিন্তু আপনার নিজের হানি বা লোকসান অবশ্যই হবে। আপনার তো কর্ম-সংস্কার তৈরী হবেই।


এগুলি কর্ম-সংস্কার কিভাবে তৈরী করে?

——————————


যা কিছু বিচার আমাদের মনে এসে থাকে, সামান্য সময়ের জন্য তা উৎপন্ন হল এবং আবার চলেও গেল। তারপরেও কর্ম-সংস্কার তৈরী হয়। তা হল জলে দাগ কাটার মত তৈরী হয়। সেগুলির কোন প্রভাব তেমন হয়না। যেভাবে যেভাবে তৈরী হয়েছে, সেভাবে সেভাবে সমাপ্তও হয়েছে। 


যদি সেগুলি অনেক সময় পর্যন্ত মনে চলতে থাকে, তা বালিতে দাগ কাটার মত কর্ম-সংস্কার তৈরী হয়। তাও কিছু সময় পরে সমাপ্ত হয়ে যায়। তা এতই শক্তিশালী নয় যে, আমাদেরকে জন্মান্তর পর্যন্ত ফল প্রদান করবে বা নতুন নতুন জন্ম প্রদান করবে।


কিন্ত যখন এ বিচার বার বার উৎপন্ন হতে গিয়ে এতই গভীরে গিয়ে থাকে যে, তা পাথরে হাতুড়ি বা ছেনীর সাহায্যে দাগ কাটার মত হয়ে যায়। যদিও আমরা বাণীতে কিছু বলি নাই এবং শরীরেও কিছু করি নাই, মনে মনেই সেগুলি রেখে দিয়ে এমন অবস্থা তৈরী করেছি যে, যেন বাক্যের দ্বারা দুষ্কর্ম করলে মনের যে অবস্থা হয় সে অবস্থা আমরা তৈরী করেছি এবং কায়ার মাধ্যমে দুষ্কর্ম করলে মনের যে অবস্থা তৈরী হয়, সে অবস্থা আমরা তৈরী করেছি এবং কর্ম তো মনেরই হয়ে থাকে।


মনের কর্মই ফল দিয়ে থাকে।


পাথরে দাগের মত যে কর্ম হবে, তা এতই গভীর যে, সেগুলির মধ্যে কোন না কোন কর্ম মৃত্যুর সময় জাগ্রত হয় এবং তাহাই পরবর্তী জন্মের কারণ হয়ে থাকে।


আমাদের এ যে ভব সংসরণ রয়েছে বা জন্ম-মৃত্যুর চক্র রয়েছে, তা মনের এ পাথরের দাগের মত কর্ম-সংস্কারের কারণেই চলমান রয়েছে। 


সেজন্য মনের উপর সংযমতা আনা অতীব আবশ্যক।


যখন কোন কর্ম করা হচ্ছে, তখন কিভাবে জানা যাবে যে ইহা ধর্ম না অধর্ম?

—————————


কর্ম করার সময় যদি নিজের ভিতর স্মৃতি দ্বারা দেখার অনুশীলন আয়ত্ব করা হয়, তখনই বুঝতে পারবেন যে, এ সময় আমার মন ময়লাযুক্ত না নির্মল। 


যদি কর্ম করার সময় মন ময়লাযুক্ত থাকে, তখন কর্ম দূষিতই হয়, অধর্মই হয় এবং কর্ম করার সময় মন যখন নির্মল থাকে, তখন তা হয় ধর্মই ধর্ম।


সেভাবে আপনি নিজেকে নিজে স্বয়ং পরীক্ষা করে দেখবেন যে, আপনার মনের অবস্থা কি রকম।

Comments

Popular Posts