বুদ্ধের অহিংসা সিদ্ধান্তের‌ আলোচনা

বুদ্ধের অহিংসা সিদ্ধান্তের আলোচনা


ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু


ভগবান বুদ্ধের অহিংসা সিদ্ধান্তের প্রায় সময় ভুল ব্যাখ্যা হয়ে থাকে। কেবল ভুল নয়, বরং ভুল আলোচনাও করা হয়ে থাকে। আলোচনা মাত্রও নয়, বরং ভুল আরোপও লাগানো হয় যে, বুদ্ধের অহিংসা সিদ্ধান্তের কারণে ভারত দেশ গোলাম হয়েছে।


যদি তা সত্য হয়, তাহলে বুদ্ধ ধম্ম ভারতবর্ষে ক্ষীণ হওয়ার পর বা ক্ষীণ করার পর ভারতের কতটুকু বিস্তার হয়েছে? ঐতিহাসিক সাক্ষ্য তো ইহাই বলে যে, যেভাবে যেভাবে দেশে বুদ্ধধম্ম ক্ষীণ হয়েছে, সেভাবে সেভাবে ভারত দুর্বল হতে গিয়েছে। বৌদ্ধকালে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এবং সম্রাট অসোকের সময় পর্যন্ত ভারতের মানচিত্র বিশালতম পাওয়া যায়। যেভাবে যেভাবে সামাজিক ভেদ-বৈষম্য বাড়তে গিয়েছে, ততই ভারত দুর্বল ও ছোট হতে গিয়েছে।


যদি বুদ্ধধর্মের অহিংসাবাদ দেশকে দুর্বল করে থাকে, তাহলে জাপান দুর্বল কেন হয়নি?কোরিয়া কি করে দুনিয়ার সাথে টক্কর দিতে যাচ্ছে? মৌলিকরূপে বৌদ্ধ সিদ্ধান্তে আপ্লাবিত চীন কি করে সশক্ত হচ্ছে? ভিয়েতনাম কি করে আত্মরক্ষা করে যাচ্ছে? থাইল্যান্ড কি করে সুরক্ষিত রয়েছে? 


ভারতীয় সংবিধানকে সংসদে পেশ করার সময় সাংসদ ভরা সংসদে স্বীয় ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা দান করার সময় ২৬ নভেম্বর, ১৯৪৯ সালে বাবা সাহেব ড. আম্বেদকর বলেছিলেন-


‘জাতি সমূহ হল রাষ্ট্রবিরোধি তত্ব।’


রাষ্ট্রকে জাতি সমূহ দুর্বল করে থাকে। জাতি সমূহকে জীইয়ে রাখার মাধ্যমে রাষ্ট্র কখনো সবল হতে পারেনা। দেশে বুদ্ধের অহিংসা নয়, জাতিই হল বিপজ্জনক। বাবা সাহেবের উপরোক্ত শব্দ প্রত্যেক রাষ্ট্রপ্রেমীর জন্য হল দিকনির্দেশক। জাতি প্রেম এবং রাষ্ট্রপ্রেম হল পরস্পর বিরোধী তত্ব। সম্রাট অসোক রাষ্ট্রের বিস্তার যুদ্ধ-নীতির দ্বারা নয়, বরং বুদ্ধ নীতির দ্বারাই করেছেন। যার কারণে আফগানিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত ভূ-ভাগ ভারত নামক রাষ্ট্রের অঙ্গ হয়ে গিয়েছিল।


বাবা সাহেব ড. ভীমরাও আম্বেদকর তাঁর সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘বুদ্ধ এবং তাঁর ধম্ম’ পুস্তকের ষষ্ট খণ্ডের তৃতীয় অধ্যায়ে মধ্যম নিকায়ের অলগদুপম সূত্রের সন্দর্ভে ‘অহিংসা সিদ্ধান্তের আলোচনা’ নামক শীর্ষকে বাবা সাহেব ভগবান বুদ্ধের অহিংসা সিদ্ধান্তের সঠিক ব্যাখ্যা করেছেন। এখানে তাঁরই শব্দে যথানুরূপ কেবল পঠনীয় নয়, বরং তা বিচারণীয় ও অনুকরণীয়ও বটে। 


অহিংসা সিদ্ধান্তের আলোচনাঃ-

—————————


এরকম লোক অনেক ছিলেন যাঁরা ‘অহিংসা’ সিদ্ধান্তের সমর্থক ছিলেননা। তাঁদের বক্তব্য ছিল যে, বুদ্ধের ‘অহিংসার অর্থ হল, ‘অন্যায়’ তথা ‘অত্যাচার’ এর সামনে মস্তক নত করা। ভগবান বুদ্ধের ‘অহিংসা’ হতে যা আশা ছিল, ইহা হল মূলতঃ তার ভুল বা অপব্যাখ্যা।


ভগবান বুদ্ধ অনেক সময়ে স্বীয় স্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যাতে কারও কোন প্রকার ভুল ধারণার বা অস্পষ্টতার অবকাশ না থাকে।


এক সময়ের একটি প্রসঙ্গ রয়েছে, যার উল্লেখ এখানে করা প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে, যখন তিনি এক সৈনিকের সঙ্ঘে প্রবিষ্ট হওয়ার সম্বন্ধে নিয়ম প্রবর্তন করেছেন।


একবার মগধের সীমান্ত প্রদেশে উৎপাত বেড়ে গিয়েছিল। তখন মগধ নরেশ সেনিয় বিম্বিসার স্বীয় সেনাপতিকে আজ্ঞা দিয়েছিলেন- এখন যাও এবং স্বীয় সেনা-নায়কদের বলো যে, তারা সীমান্তে খুঁজে খুঁজে অপরাধীদেরকে বের করুক, তাদেরকে দণ্ড দিয়ে সেখানে শান্তি স্থাপন করুক।’ সেনাপতি রাজাজ্ঞা পালন করেছিলেন। 


সেনাপতির আজ্ঞা পেয়ে সেনা-নায়কগণ বড়ই দ্বিধা দ্বন্দ্বে পড়ে গিয়েছিলেন। তাঁরা জানতেন যে, তথাগতের শিক্ষায় যারা যুদ্ধে যায় এবং যারা যুদ্ধে আনন্দিত থাকে, তারা ‘পাপ’ করে থাকে এবং অনেক ‘অপুন্য’  লাভ করে থাকে। অন্যদিকে রাজার আজ্ঞা ইহা ছিল যে, অপরাধীদেরকে খুঁজে বের করে তাদেরকে হত্যা করা হোক। সেনা-নায়কগণ নিজ হতে জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন-আমরা এখন কি করব?’


তখন সেনা-নায়কগণ চিন্তা করলেন-‘যদি আমরা তথাগতের ভিক্ষু সঙ্ঘে যোগদান করি তাহলে আমরা এ দ্বিধা হতে বাঁচতে পারব।’


এ চিন্তা করে সেনা-নায়কগণ ভিক্ষু সঙ্ঘের নিকট গেলেন এবং তাঁদের কাছ হতে প্রব্রজ্যা প্রার্থনা করলেন। ভিক্ষুগণ তাঁদেরকে প্রব্রজ্যা ও উপসম্পাদা প্রদান করলেন। সেনা-নায়কগণ সৈন্যদল হতে গায়েব হয়ে গেলেন।


সেনাপতি যখন দেখলেন যে, সেনা-নায়কগণকে দেখা যাচ্ছেনা, তখন তিনি সেনাদের থেকে জিজ্ঞাসা করলেন-সেনা-নায়কগণকে দেখা যাচ্ছেনা কেন?’ সৈনিকেরা উত্তর দিলেন-‘সেনাপতি! সেনা-নায়কগণ ভিক্ষু সঙ্ঘে সম্মিলিত হয়ে গিয়েছেন।’


তা শুনে সেনাপতি অনেক অপ্রসন্ন ও অনেক ক্রোধান্বিত হয়েছিলেন এবং বললেন-‘রাজ সেনাদেরকে ভিক্ষু সঙ্ঘ কি করে প্রব্রজ্যিত করতে পারেন?’


সেনাপতি এ বিষয়ে রাজাকে জ্ঞাপন করলেন। রাজাও তা শুনে ন্যায়াধীশদের নিকট গিয়ে পরামর্শ করলেন এবং বললেন-‘অনুগ্রহ করে আপনারা বলুন যে, যারা রাজকীয় সেনাকে প্রব্রজ্যিত করে তাদেরকে কিরকম দণ্ড প্রদান করা উচিত?’


ন্যায়াধীশগণ বললেন-মহারাজ! যিনি উপাধ্যায় তাঁর মস্তক কেটে নেওয়া উচিত। কর্মবাচা পাঠকারী আচার্যদের জিহ্বা কেটে নেওয়া উচিত এবং সঙ্ঘের যে সদস্যেরা সৈনিকদের প্রব্রজ্যিত করে, তাদের বুকের পাঁজর ভেঙ্গে দেওয়া উচিত।’ 


তখন রাজা ভগবান সমীপে পৌঁছলেন এবং ভগবানকে অভিবাদন করে একান্তে উপবেশন করে এ কথা ভগবানকে শুনালেন। 


তিনি বললেন-‘ভগবান! আপনি জানেন যে, কোন কোন রাজা ধর্মের বিরুদ্ধ হয়। এ সকল বিরোধী রাজা অনেক সাধারণ সাধারণ বিষয়ের জন্য ভিক্ষু সঙ্ঘকে কষ্ট দিতে তৈরী হয়। যদি তাঁরা জানেন যে, ভিক্ষুরা সৈনিকদেরকে নিয়ে এসে প্রব্রজ্যিত করে ভিক্ষু সঙ্ঘে সামিল করে থাকেন, তখন ইহা কল্পনা করাও কঠিন হবে যে, তাঁরা ভিক্ষু সঙ্ঘের বিরুদ্ধে কি কি ব্যবস্থা নিতে পারে। এ বিপত্তি হতে বাঁচার জন্য তথাগত আপনি যথাযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।’


এর জবাবে তথাগত বললেন-‘আমার ইহা কখনও ইচ্ছা ছিলনা যে, ‘অহিংসা’র নাম নিয়ে বা ‘অহিংসা’র আড়ালে সৈনিকেরা নিজেদের রাজ্য বা রাজার প্রতি যা তাদের কর্তব্য রয়েছে, তা হতে বিমুখ হবে।’


তদনন্তর ভগবান বুদ্ধ রাজকীয় সৈনিকদেরকে সঙ্ঘে যোগদানের বিরুদ্ধে বিনয়ের আইন প্রজ্ঞাপ্ত করে দিয়েছেন এবং তিনি ঘোষণা করে দিলেন যে-‘ভিক্ষুগণ! কোন রাজকীয় সৈনিককে প্রব্রজ্যা উপসম্পাদা প্রদান করবেনা।যদি কেহ প্রব্রজ্য-উপসম্পাদা প্রদান করে, তার ‘দুক্কট’ বা দুষ্কৃত অপরাধ বা আপত্তি হবে।’


একবার মহাবীর স্বামীর অনুসারী সিংহ সেনাপতি ‘অহিংসা’ বিষয়ে তথাগতের কাছ হতে প্রশ্ন করেছিলেন। সিংহ জিজ্ঞাসা করেছিলেন-‘ভগবান! এখনও আমার মনে এক সন্দেহ রয়ে গিয়েছে। আপনি কি আমার মনের সন্দেহ দূর করে দিবেন? যাতে ধর্ম আমি সেরূপেই বুঝতে সক্ষম হই যেরূপে আপনি ধর্মের প্রতিপাদন করে থাকেন?’


তথাগত তাঁর প্রশ্ন স্বীকার করে নেওয়ার পর সিংহ সেনাপতি পুনঃ বললেন-‘ভগবান! আমি হলাম সেনাপতি। রাজা আমাকে যুদ্ধ করার জন্যই নিযুক্ত করেছেন। তথাগত দুঃখীদের প্রতি দয়া এবং অসীম করুণার যে শিক্ষা দিয়ে থাকেন, তাতে আপনি কি অপরাধীদের দণ্ড দেওয়ার অনুমতি প্রদান করেন? এবং তথাগত কি ইহাও বলে থাকেন যে, স্বীয় ঘর, স্ত্রী, পুত্র-কন্যা এবং স্বীয় সম্পত্তি রক্ষার জন্য যুদ্ধ করা ঠিক নয়? তথাগত কি সম্পূর্ণরূপে আত্ম সমর্পণ করার জন্যই শিক্ষা দিয়ে থাকেন এবং আততায়ী যা ইচ্ছা করার তাকে তা কি করতে দেওয়া উচিত? এবং যারা জোরজবরদস্তি করে অন্যায়ভাবে আমাদের সম্পত্তি ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তাদেরকে তা কি করতে দেওয়া উচিত? তথাগত আপনি কি ইহা বলেন যে, সমস্ত প্রকার যুদ্ধ এবং এরকম যুদ্ধও যা ন্যায়ের জন্য লড়তে হয়, তাও কি না করতে শিক্ষা দেন?’


এর জন্য তথাগতের উত্তর ছিল-‘যে দণ্ডনীয়, তার দণ্ড পাওয়া উচিত। যে উপহার পাওয়ার যোগ্য, তার উপহারই পাওয়া উচিত। সাথে ইহাও ধ্যান রাখা উচিত যে, কোন প্রাণীকে অযথা কষ্ট দেওয়া উচিত নয়। বরং তার সাথে দয়া ও প্রেমের ব্যবহার হওয়াই উচিত। এরূপ শিক্ষা পরস্পর বিরোধী নয়। যে কেহ স্বীয় অপরাধের জন্য দণ্ড যোগ্য, তা ন্যায়াধীশের দ্বেষ-বুদ্ধির কারণে নয়, বরং স্বীয় অকুশল কর্মেরই পরিণাম স্বরূপ ভোগ করছে। ন্যায়াধীশ দ্বারা প্রদত্ত দণ্ড হল তার কর্মের ফল। বিচারক যখন দণ্ড প্রদান করেন, তখন তাঁর মনে দণ্ডনীয় ব্যক্তির প্রতি কোন প্রকার দ্বেষ ভাবনা হওয়া উচিত নয় এবং এক হত্যাকারীকেও যখন ফাঁসির সাজা দেওয়া হয়, তখন ইহাই ভাবা উচিত যে, ইহা হল তার কর্মেরই ফল। যখন সে ইহা বুঝতে পারবে যে, ‘দণ্ড’ তার অন্তরতমকে শুদ্ধই তৈরী করবে, তখন কেহই দণ্ডনীয় ব্যক্তি স্বীয় ভাগ্যকে দোষারোপ নয়, বরং প্রসন্নই হতে হবে।’


এ কথা সমূহ ভালমতে বিচার করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যে, ভগবান বুদ্ধের দেশনায় ‘অহিংসা’র স্থান হল মুখ্য, কিন্তু তা নিরপেক্ষ সবসময় হয়না।


তিনি শিখিয়েছেন যে, মন্দকে ভাল দ্বারা জয় করতে হবে, কিন্তু ইহা কখনও শিখাননি যে, মন্দের দ্বারাই ভালকে জিততে হবে।’


তিনি ছিলেন অহিংসার সমর্থক এবং হিংসার নিন্দক। কিন্তু তিনি ইহাও বলেছেন যে, মন্দকে ভালোর দ্বারা জয় করার জন্য কখনও কখনও শেষ পর্যন্ত হিংসারও আশ্রয় নিতে হয়। 


ভগবান বুদ্ধ কোন বিপজ্জনক সিদ্ধান্তের প্রতিপাদন করেননি। আলোচকই ইহার যথার্থ স্বরূপ এবং ক্ষেত্রকে সঠিকভাবে বুঝতে পারেনি।

Comments

Popular Posts