নোট‌ পেষ্ট‌ ৫/৮/২০২২

 হিটলারের দেশে বুদ্ধ


ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু


বুদ্ধের ধর্ম সম্রাজ্য বিস্তারের পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপীয় দেশ সমূহের মধ্যে ইংল্যান্ডের প্রমুখ প্রতিদ্বন্দ্বী বলা যায় জার্মানীকে। বুদ্ধ এবং বৌদ্ধ ধর্মকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে যত উৎসাহ বৃটেনের লোকের মধ্যে রয়েছে, জার্মানীও তার পেছনে নেই। 


জার্মানির প্রথম সুপ্রসিদ্ধ দার্শনিক অর্থর শোপেনহাওয়ার (Arthur Schopenhauer-1788-1860) বৌদ্ধধর্ম এবং দর্শনের দিকে আকর্ষিত হয়েছিলেন। তৎকালীন সময় পর্যন্ত ইউরোপীয় ভাষা সমূহে বৌদ্ধ ধর্মের উপর পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া অসম্ভব ছিল। তারপরেও তিনি রাশিয়ান, জার্মান, ফ্রান্স, ডেনমার্ক এবং ইংরেজীতে প্রাপ্ত সাহিত্য সমূহ মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন করেছিলেন। সী. পী. কোপ্পেনের পুস্তক ‘Religion of the Buddha’ তাঁকে অনেক বেশী প্রভাবিত করেছিল। বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব বিচার ‘The World As will and Representation’ পুস্তকে তিনি ব্যক্ত করেছেন। 


প্রারম্ভের দিকে জার্মানীতে বৌদ্ধ ধর্ম পৌঁছেছিল পুস্তকের মাধ্যমে। পালি সাহিত্যের স্রোতের ভিত্তিতে ১৮৮১ সালে জার্মান বিদ্বান হার্মান ওল্ডেনবার্গ (Hermann Oldenberg 1854-1920) কর্তৃক লিখিত ‘ The Life and Teachings of Buddha’ পুস্তক প্রকাশিত হয়েছিল। এ পুস্তক জার্মানীতে অনেক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। 


প্রখ্যাত জার্মান দার্শনিক ম্যাক্স মুলারের (Max Müller 1823-1900) গ্রন্থমালা ‘Sacred Books of the East Series’  এবং ‘Sacred Books of Buddhist Series’ জার্মানীতে অপার লোকপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। এ গ্রন্থমালা সমূহও সেখানে বুদ্ধ এবং বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি পর্যাপ্ত আকর্ষণ সৃষ্টি করেছিল। 


ম্যাক্স মুলারের সমকালীন গবেষক রিচার্ড কাল বান গার্বেকে(Richard Karl von Garbe-1857-1927) বৌদ্ধধর্মের আগম সূত্রের বিশেষজ্ঞ বিদ্বান মান্য করা হত। তিনি অনেক আগম সূত্রের অনুবাদ এবং সেগুলির উপর টীকা ও গবেষণা পূর্ণ লেখনী প্রকাশ করেছিলেন। রিচার্ড কার্লের প্রতিভার ছায়ায় তাঁর অনেক খ্যাতিমান ছাত্র তৈরী হয়েছিল, যাঁরা তাঁদের গবেষণা, লেখন এবং অধ্যয়নের বিষয়রূপে বৌদ্ধধর্মের বিষয়কে নির্বাচন করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে সংস্কৃত ও তিব্বতি ভাষা সমূহের বিশেষজ্ঞ বিদ্বান হার্মন ওয়েল্লর (Hermann Weller-1878-1956), জাপানী বিদ্বান ওতানাবে কাইক্যোকু ও ওগীহারা উনরাই প্রমুখ ছিলেন অন্যতম। হার্মান ওয়েল্লরের পাণ্ডিত্যপূর্ণ পুস্তক ‘The Philosophical Foundation of ancient Buddhism’ (1904), ‘The Sects of Ancient Buddhism’ (1927) গ্রন্থদ্বয় জার্মানীতে অনেক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। এ গ্রন্থ সমূহ জার্মানির মানুষের মন এবং মস্তিস্কে গভীর ছাপ ফেলেছিল। 


এগুলি ছাড়াও বৌদ্ধ সূত্র সমূহের অনুবাদ ও অধ্যয়নে কার্ল গোতফ্রাইড ন্যুমেন (Carl Gottfried Neumann 1832-1925),  ভদন্ত ঞাণতিলোক মহাথের ( Ven. Nyanatiloka Mahathera 1878-1957), কার্ল সিডেনস্টকর, পল ডাল্কে (Paul Dahlke 1865-1928), উইলিয়ম গাইগার (Wilhelm Ludwig Geiger 1856-1943), জুলিয়স ডুটওয়াইট, মেক্সওলেসর প্রভৃতি বিদ্বানেরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁদের প্রয়াসের ফলশ্রুতিতে বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভের বছর সমূহে জার্মানির প্রায় সব বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ Buddhology’ নামে এক নতুন বিষয় পাঠ্যক্রমে যুক্ত হয়েছিল এবং জার্মান শিক্ষার্থীদের মধ্যে আজও ইহা সবচেয়ে সম্মানিত এবং জনপ্রিয় বিষয় হয়ে রয়েছে, যা সম্পূর্ণরূপে বুদ্ধ এবং বৌদ্ধ ধর্মের অধ্যয়নে সমর্পিত রয়েছে। 


জ্ঞাত সূত্রের ভিত্তিতে ‘ Buddhist catechism’ পুস্তকের রচয়িতা বিদ্বান জিম হারমন (Jim Harmon) ছিলেন প্রথম জার্মানবাসী, যিনি বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং তিনি ১৮৮৮ সালে ভিক্ষু হয়ে সুভদ্র নাম ধারণ করেছিলেন। 


জার্মানীতে বৌদ্ধধর্মের প্রতি আকর্ষণ এক আন্দোলনরূপে দেখা দিয়েছিল। যার প্রভাবে জার্মান বিদ্বান ন্যুমেন এবং ওল্ডেনবার্গও বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁদের দীক্ষিত নাম যথাক্রমে ‘ভিক্ষু ঞাণতিলোক’ এবং ‘লামা গোবিন্দ’ হয়েছিল।


১৯০৩ সালে জার্মানে ‘Buddhist Mission Society’র স্থাপনা হয়েছিল এবং ১৯০৬ সালে ‘Buddhist Congress’ এর অধিবেশন হয়েছিল। ১৯২১ সালে ‘Old Buddhist Community’ নামক সংস্থার স্থাপনা হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বার্লিনের গুইডো আষ্টর কর্তৃক ‘ Buddhist Secretariat’ নামক সংস্থার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল এবং ১৯৫৫ সালে ‘ড্যুৎ্সে বুড্ডিষ্ট ইউনিয়ন’ নামে সংস্থা অস্তিত্বে এসেছিল।


যুদ্ধের পরে বুদ্ধের কথা বেশী করে বুঝতে সক্ষম হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বার্লিনে ১৯৫২ সালে ‘আর্য মৈত্রেয় মণ্ডল’, ১৯৫৬ সালে বুড্ডিষ্টিক জিমেনশাপ্ট জোডো শিন্শু’ এবং ১৯৬৪ সালে পর্যন্ত জেন পরম্পরাও জার্মানীর ভূমিতে পা রেখেছিল। 


নোবেল পুরস্কার বিজেতা জার্মান উপন্যাসিক হার্মন হেস (Hermann Hesse ১৮৭৭-১৯৬২) স্বীয় লেখনীতে স্থানে স্থানে বৌদ্ধ প্রভাব উপস্থাপন করেছেন। বিশেষকরে তাঁর সর্বাধিক চর্চিত ‘সিদ্ধার্থ’ নামক উপান্যাস সমগ্র ইউরোপে অতীব জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। মূলতঃ জার্মান ভাষায় লিখা এ উপান্যাস ১৯২২ সালে ইংরেজীতে এবং পৃথিবীর অন্য অনেক ভাষায় এর অনুবাদ হয়েছিল। সত্তরের দশকে এ উপান্যাসকে ভিত্তি করে ভারতে কালজয়ী ‘সিদ্ধার্থ’ চলচ্চিত্রও তৈরী হয়েছিল, যা আজ শাস্ত্রীয় ক্লাসিক আখ্যা পেয়েছে। জার্মান ভাষায় ডব হয়ে এ চলচ্চিত্র জার্মানীতেও আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। 


উইলিয়ম গাইগার, মোরিট্জ উইন্টারনিট্জ (Moritz Winternitz-1863-1933), অংর্স্ট ওয়িন্ডিশ, রিচার্ড পিশেল, এরিক ফ্রাউবালনট্জ, হেনরিখ জিম্মর, হার্মন বেক্খ, উইলিয়ম স্টীড, কুই স্মিত প্রভৃতি বিদ্বানেরা  হলেন উল্লেখযোগ্য, যাঁরা জার্মানীতে বৌদ্ধধর্মের ধর্ম পতাকা প্রতিষ্ঠা করতে নিজেদের কলম এবং কৃতিত্বের দ্বারা অনন্য অবদান রেখেছেন।


বর্তমানে একবিংশ শতাব্দী আসতে আসতে জার্মানীতে বৌদ্ধধর্ম কেবল দার্শনিক চর্চার বিষয় হয়ে থাকেনি, বরং হিটলারের এ দেশে বুদ্ধ প্রেমীদের সংখ্যা নিরন্তর বৃদ্ধি প্রাপ্ত হচ্ছে। পূর্ব এবং পশ্চিম জার্মানী একত্রিত হয়েছে। পল ডাল্কের দ্বারা বার্লিনে স্থাপিত ‘Buddhist Retreat Centre’ বর্তমান সময়ে কেবল জার্মানীতে নয়, বরং সমগ্র ইউরোপে সবচেয়ে জীবন্ত বৌদ্ধ কেন্দ্রের মধ্যে গণ্য হয়, যেখানে লোক গম্ভীরতা সহকারে বৌদ্ধ পদ্ধতিতে ধ্যান-সাধনার অনুশীলন করে থাকে এবং বৌদ্ধ সূত্র সমূহের অধ্যয়নও করে থাকে। বিশ্বযুদ্ধের বিভিষিকায় নির্ণায়ক থাকা এ দেশে এখন গেরুয়া চীবরধারী বৌদ্ধ ভিক্ষুর সংখ্যাও প্রচুর দেখতে পাওয়া যায়। বর্তমানে জার্মানীতে প্রায় পঁচিশ হাজার রেজিষ্ট্রিকৃত জার্মান বৌদ্ধ রয়েছে।

Comments

Popular Posts