26.10.2022

 কথা কটু হলেও সত্য 


ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু


পাথরে ঈশ্বর এবং মানুষের মধ্যে যাদের উঁচু-নীচু, ছুত-অচ্ছুত, লিঙ্গ ভেদাভেদ নজর এসে থাকে, তারা মানবতার জন্য দুষ্টলোক ছাড়া আর কিছু নয়। 


জাতি কেবল দু’রকমই হয়ে থাকে। নারী এবং পুরুষ। ধর্ম হয় কেবল একটি। তাহল মানবতা। বাকী সব হল ষড়যন্ত্র, প্রতারণা এবং অন্ধবিশ্বাস। 


যে অন্ধ বিশ্বাস হতে মুক্ত হতে চায়, সে যে কোনভাবে নিজেকে মুক্ত করে নেবেই, কিন্তু যে অন্ধবিশ্বাস হতে মুক্ত হতে চায়না, সে নিজের সাথে সাথে অনাগত বংশদেরকেও গোলাম বানিয়ে দেয়। কথা কটু হলেও কিন্তু সত্য। 


কিছু ভাল হলে তখন বলা হয় ভগবান ইহা করেছেন। কিন্তু কিছু খারাপ হলে তখন বলা হয় ইহা কর্মে লিখা ছিল। যা অতীত অনেক জন্মের পাপের ফল। ইহাকেই বলা হয় মানসিক দ্বিচারিতা।


ধর্ম হল লালচ সম্পন্ন অন্ধ বিশ্বাস এবং প্রতারকদের হাতিয়ার। ধর্ম হতে ভয়ের ক্ষেত হয়ে থাকে, যেখানে আস্থাকে বপন করা হয় এবং অন্ধশ্রদ্ধা ফসল হয়ে থাকে। 


ঈশ্বর, গড এবং আল্লাহ হতেও পোষা কুকুর বিশ্বস্থ হয়ে থাকে। চোর, ডাকাত আসলে তখন অন্ততঃপক্ষে ঘেউ ঘেউ করে হলেও মালিককে সজাগ করতে থাকে। 


ধার্মিক স্থানে লাগানো বড় বড় তালা এবং CCTV ক্যামরা চিৎকার দিয়ে দিয়ে বলছে যে, সৃষ্টির তথাকথিত পরিচালক নিজের ঘরকেও সুরক্ষা করতে সক্ষম নয়। 


মাছকে জল হতে তুলে মন্দির-মসজিদে ছেড়ে দিন। যদি সেখানে বেঁচে যায় তাহলে বুঝে নিবেন বাঁচা-মরা ঈশ্বর বা আল্লাহর হাতে রয়েছে। 


যদি পূজা পাঠ এবং দান-দক্ষিণা দ্বারা ঈশ্বর খুশী হয়ে কারো পাপ সমূহের ক্ষমা করে থাকেন, তাহলে এর চেয়ে অধিক দুর্নীতি এবং ঘুষখোর আর কেহ নাই। 


এবাদতের ফলে পাপীকে ক্ষমা করা হয় এবং প্রার্থনা, ব্রত ও স্নানের দ্বারা পাপ ক্ষয় হয় বা ধৌত হয় যতদিন ধর্ম গ্রন্থের এ বিশ্বাস চলতে থাকবে, পৃথিবী হতে ততদিন দুর্নীতি ও পাপাচার শেষ হবেনা। 


নারিকেল মাথায় ভাঙ্গুন অথবা জমিনে ভাঙ্গুন, তাতে দেবতা কখনও প্রকটও হয়নি এবং কখনও হবেওনা। 


ধর্ম স্থানের দেওয়ালে লিখা থাকে ভগবান আপনার সমস্ত মনোকামনা পুরণ করবেন এবং বাহিরে ধর্মস্থানের বোর্ড লাগিয়ে রেখেছে ধর্মস্থান নির্মাণে আপনার সহযোগ কামনা করছি। 


যে সমস্ত ধর্মে পাপ ধৌতকরণ ও পাপ মাফ করার ব্যবস্থা রয়েছে, সে ধর্ম কখনও পাপমুক্ত হতে পারবেনা। 


পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দুর্নীতি হল মন্দির ও মাজার সমূহে প্রদত্ত অর্থ, যা এখনও পর্যন্ত ঈশ্বর বা আল্লাহর নিকট পৌঁছেনি…..।


অপারেশন থিয়েটারে ডুকার সময় শরীর হতে যাবতীয় তাবিজ, লকেট, আংটি, মঙ্গল সূতা, চুড়ি সবই খুলে ফেলতে হয়। লোকেরা তা মেনেও নেয়। তখন আস্থার ডর কোথায় যায়? 


আমাদের সমাজে কিছু পরম্পরা, সংস্কৃতি এবং মনগড়া রীতি-রেওয়াজ কেবল অজ্ঞানতা এবং কাল্পনিক মান্যতার কারণে আমাদের পূর্বপুরুষ থেকে নিয়ে এখন আমাদের প্রজন্ম পর্যন্ত বোঝা এবং শোষণরূপে চালু রয়েছে। যেগুলির বাস্তবিকতা এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ হতে কোন মহত্বই নাই। অনাগত প্রজন্মকে এ সমস্ত কুপ্রথা, অন্ধবিশ্বাস, প্রতারণা ও কু-রীতি হতে আমরা কি মুক্ত করতে পারবনা? 


আস্থায় লোকেরা এতই অন্ধ হয়ে যায় যে, ঔষধ খেয়েও বলে থাকে, উপরওয়ালা’র কৃপায় ভাল হয়েছি।


নিজের ব্যাথা অনুভব করা হল জীবিত থাকার প্রমাণ। কিন্তু অন্যের দুঃখ-ব্যাথা অনুভব করা হল মানুষ হওয়ার প্রমাণ। 


মানুষও কতই নাদান হয়, মন্দিরে শঙ্খ, ঘন্টা বাজিয়ে ভগবানকে জাগ্রত করে, অথচ নিজে শুয়ে থাকে। ক্ষুধার্তকে ভোজন দেয়না, অথচ নানা প্রকারের ভোগ ভগবানকে দিয়ে থাকে। অন্ধকার নিজের মনে রয়েছে, কিন্তু মন্দিরে আলো জ্বালিয়ে থাকে। 


সমাজের জন্য যুদ্ধ করা এতই সহজ নয়। কেননা সর্বপ্রথম তারাই আপনার বিরুদ্ধে আঙ্গুলি উঠাবে, যাদের জন্য আপনি যুদ্ধ করছেন। 


ধর্মের প্রথম এবং অন্তিম জবাব হল যদি আপনি বেঁচে যান, তাহলে তা হল ‘ভগবানের কৃপা বা মেহেরবানী।’ আর যদি না বাঁচেন তাহলে বলা হয় ‘যা হওয়ার তা কেহ খণ্ডাতে পারেনা।’


যদি আপনি মন্দির, মসজিদ বা চার্চে দান করছেন, তাহলে মেনে নিন যে, আপনি এরকম অনেক লোককে পালন-পোষণ করছেন যারা ধার্মিক দাঙ্গা, মনুষ্য মনুষ্যের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ প্রসারণ, জাতিবাদ, আড়ম্বর, অন্ধ বিশ্বাস ইত্যাদি ছড়িয়ে দেওয়ার কারণ হচ্ছেন।


যারা কেবল বেঁচে থাকতে চায় তারা চুপ থাকে। কিন্তু যারা স্বাভিমানের সাথে বাঁচতে চায়, তারাই হক এবং অধিকারের জন্য লড়াই করে। 


ধর্মের সবচেয়ে বিপজ্জনক পক্ষ হল ইহা কুতর্কের গুণগান করে থাকে এবং অন্যায়কে ন্যায়ের নজরে দেখে। 


বৈদিক কালে মন্ত্র পাঠ করার অপরাধে যে শুদ্রদের জিহ্বা কেটে নেওয়া হত, বর্তমানে সে শুদ্রের আওলাদ ( বংশধরেরা) মন্ত্র শুনার জন্য পয়সা দিয়ে থাকে। 


আমাকে ভগবানই বলেছেন যে-‘মন্দির সমূহে তাঁর নামে যা কিছু সোনা, রূপা, গয়না, ফল, মিষ্টি, প্রসাদ অর্পন করা হয়, সেগুলির কিছুই ভগবান পর্যন্ত পৌঁছে না। মধ্যখানে সেগুলি কেহ আত্মসাৎ করে নেয়।’ যদি তা সত্য হয়, তা হল ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুর্নীতি। 


আস্তিকেরা লোকদেখানো হয়ে থাকে। ঘরে সবচেয়ে শক্তিমান ঈশ্বরের ফটো বা মুর্তি রেখে থাকে, কিন্তু বাহিরে যাওয়ার সময় ঘরে তালা লাগিয়ে যায়। সর্ব শক্তিমান ঈশ্বর যদি ঘরেই থাকেন তাহলে ডর কিসের? 


এক সর্প হতেও বিষধর ও বিপজ্জনক হল অন্ধবিশ্বাস। কেননা সর্প একটি মনুষ্য জীবনকে বিনাশ করে থাকে। কিন্তু অন্ধবিশ্বাস অনাগত প্রজন্মকেও ভোগান্তি দেয়। 


দান-দক্ষিণা এবং পরদত্তের লালসায় হাজার হাজার বছর হতে প্রতারণা এবং অন্ধবিশ্বাস প্রসারণকারী হারামখোরদেরকে সর্বদা দূরে রাখাই উচিত। 


নারীরা যদি মনে করে যে, ধর্ষণ হওয়া উচিত নয়, তাহলে ধর্ষণকারীদেরকে দেবতা ও ধর্মগুরু মানার শাস্ত্র সমূহকে আগুনে পুড়ে ফেলা উচিত।


এখনও হাতে থাগা, গলায় তাবিজ, ঘর সমূহ হতে কালো মুখাকৃতি যারা হটাতে পারেনি, তাহলে ভাবতে হবে তারা মস্তিস্ক হতে মুক্ত কখনও হতে পারবেনা। 


চাকরিজীবি পড়া লেখা জানা লোক সমাজকে এজন্যই পরিবর্তন করতে পারছেননা, তাঁরা পড়া লেখা করেছেন কেবল চাকরি এবং উদর পুর্তির জন্য…।


মানুষ প্রথমে জাত দেখে, গোত্র দেখে, খানদান দেখে, কুষ্ঠি বা ঠিকুজী দেখে, আবার বলে থাকে যে, জোড় তো উপরওয়ালাই বানিয়ে থাকে।


বড় বড় ডায়নোসোরাসের জীবাশ্ম বা কঙ্কাল পাওয়া গিয়েছে, কিন্তু বিশাল শরীরধারী কুম্ভকর্ণ যে ছিল, তার কিছুই পাওয়া যায়নি। 


নিজেকে আদম-হাওয়া, এডম-ইব এবং মনু-শতরূপার বংশধর মান্যতাকারীরাও পরীক্ষার খাতায় চার্লস ডারউইনের বিবর্তনবাদের থিওরি লিখে থাকে। 


যদি কেহ দার্শনিক হয় বা সাধু হয় বা মৌলানা হয় এবং যদি তারা লোকদেরকে অন্ধকারের ভয় দেখায়, তখন অবশ্যই বুঝতে হবে তারা নিজের কোম্পানীর টর্চ বিক্রি করতে চায়। 


কোথাও স্বর্গও নেই, কোথাও নরকও নেই, অশিক্ষা, অজ্ঞানতা, প্রতারণা এবং অন্ধভক্তিই হল নরক। উচ্চ শিক্ষা, সততা, জ্ঞান সম্পন্নতাই হল স্বর্গ। 


বিজ্ঞানের আবিস্কার হল বিভিন্ন প্রকারের মেশিন বা যন্ত্র। লাইট, ইন্টারনেট, মোবাইল, কম্প্যুটর এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষার নানা যন্ত্র ইত্যাদি। সতীপ্রথা, হালাল, তিন তালাক, ধর্ষণ, ছুত-অচ্ছুত, জাতিবাদ, দাঙ্গা, ভেদাভেদ এসমস্ত হল মানব জাতির কলঙ্ক। 


অন্ধবিশ্বাস এরকম এক রোগ, যা দুধকে লিঙ্গের উপর ঢেলে ফেলে দেয় এবং গোবর ও মূত্রকে পান এবং পূজা করায়।  (চলবে…)

Comments

Popular Posts