31/10/2022

বৌদ্ধ পরম্পরায় হীনযান এবং মহাযান

ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু

সত্যিকারভাবে ‘হীনযান’ বলে কোন যানের অস্তিত্বই নাই। মূলত: ইহা হল থেরবাদ। যাকে নীচু দেখাবার জন্য হীনযান আখ্যায়িত করে সম্বোধন করা হয়েছে। 

ধর্মীয় ইতিহাস বলে থাকে যে, দুনিয়ার প্রত্যেক ধার্মিক বিচারধারায় সেগুলির সংস্থাপকের মৃত্যুর পরে মোটামুটিভাবে অন্তত:পক্ষে দু’ অথবা দু’য়ের অধিক বিভাজন হয়ে গিয়েছে। যেমন, জৈনদের বিভাজন হল শ্বেতাম্বর ও দিগম্বর, খৃস্টানদের প্রধান বিভাজন হল ক্যাথলিক ও প্রোটেস্টন্ট, ইসলামে বড় দু’টি বর্গ হল শিয়া ও সুন্নী, শিখ পন্থদের মধ্যে প্রধান দু’টি বিভাজন হল আকালী ও নিরঙ্কারী এবং হিন্দুদের মধ্যে হয়েছে শৈব, শাক্ত এবং বৈষ্ণব। তেমনি বৌদ্ধদের মধ্যে হয়েছে সর্বাধিক বিভাজন।বৌদ্ধদের নিকায়ের সংখ্যা হল ১৮। 

সেগুলি হল নিম্নরূপ-
১) মহাসাংঘিক অথবা মহাযান
২) একব্যাবহারিক
৩) গোকুলিক
৪) প্রজ্ঞপ্তিবাদী
৫) বাহুলিক অথবা বহুশ্রুতিক
৬) চৈত্যবাদী
৭) থেরবাদী
৮) বজ্জিপুত্তক
৯) মহিশাসক 
১০) ধর্মোত্তরীয়
১১) ভদ্রযানিক
১২) ছন্নাগরিক
১৩) সম্মিতীয়
১৪) ধর্মগুপ্তিক
১৫) সর্বাস্তিবাদী
১৬) কাশ্যপীয়
১৭) সাংক্রান্তিক এবং 
১৮) সৌত্রান্তিক

ইহাই দেখা গিয়েছে যে, প্রত্যেক বিভাজিত বর্গ ইহা প্রমাণ করতে প্রয়াস করেছে যে, নিজেদের সংস্থাপকের শিক্ষা সমূহের তাঁরাই সঠিক ও কঠোরতা সহকারে পালন করছেন, অন্যরা বিচলিত হয়েছে, শিথিল হয়েছে অথবা হচ্ছে। 

ইতিহাস ইহাও সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, এ সমস্ত ধর্মীয় বিভাজন উগ্রও হয়েছে, হিংস্রও হয়েছে, হত্যা-খুনাখুনি পর্যন্ত হয়েছে এবং এক বর্গ অন্য বর্গকে ‘হীন’ প্রমাণ করার প্রবলতম প্রয়াস পর্যন্ত করেছে। এখানে কথিত ‘হীনযান’ সে প্রবৃত্তিরই পরিচায়ক। 

কিন্তু সবচেয়ে রোচক তথ্য ইহাই যে, বৌদ্ধদের আঠার নিকায়ের মধ্যে সৈদ্ধান্তিক বাদ-বিবাদ, তর্ক-বিতর্ক, শাস্ত্রার্থ যতই হোক না কেন, কিন্তু অন্যান্য ধর্ম সম্প্রদায়ের মত বৌদ্ধ নিকায় সমূহের মধ্যে কখনও হিংস্র সংঘর্ষ হয়নি। ইতিহাসে এরকম একটি সাক্ষ্যও পাওয়া যায়না। তৃতীয় বৌদ্ধ সঙ্গীতির সময় এ মতভেদ চরমে এসে পৌঁছেছিল যখন থেরবাদীরা মহাসাংঘিকদেরকে সম্রাট অসোকের রাজাদেশ দ্বারা বাচাই করে সংঘ হতে বের করে দিয়েছিলেন। এ ঘটনা হতে কথিত মহাসাঙ্ঘিক অথবা মহাযানের উদয় হয়েছে। তাঁরাই মূল থেরবাদী সঙ্ঘকে হীনযান বলে আখ্যায়িত করেছে এবং নিজেদেরকে মহাযান বলে পরিচিত করিয়েছে। ধর্মের নামে উৎপন্ন হওয়া মিথ্যা মত সমূহের খণ্ডনের জন্যই তৃতীয় বৌদ্ধ সঙ্গীতিতে ‘কথাবত্থু’ নামক গ্রন্থ ত্রিপিটকে অস্তিত্বে এসেছে। সর্বাধিক উল্লেখনীয় তথ্যা ইহাই যে, কথিত হীনযান এবং মহাযানের বিভাজন তথা কালান্তরে বজ্রযান, মন্ত্রযান, তন্ত্রযান, সহজযান, যোগাচার, মাধ্যমিক, সৌত্রান্তিক ইত্যাদি আঠার নিকায়ের শাখা-উপশাখা সমূহের সৈদ্ধান্তিক মতভেদেও এক মতৈক্যতা দেখার মত যে, বৌদ্ধদের সমস্ত নিকায়ে বুদ্ধ, ধর্ম, সঙ্ঘ-এ তিন রত্নের মান্যতায় কোন মতভেদ নাই। এখন আঠার নিকায় বুদ্ধ, ধর্ম এবং সঙ্ঘ এ ত্রিরত্নকে নিজেদের কেন্দ্রীয় তত্ব বলে মান্য করে। ত্রিশরণ, পঞ্চশীল, চার আর্যসত্য, আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ, দ্বাদশ নিদান অর্থাৎ প্রতীত্য সমুৎপাদ এগুলির উপর কারো কোন মতভেদ নাই। অধিকতর মতভেদ দেখা যায় পূজা পদ্ধতি অথবা ধ্যানের আলম্বনকে নিয়ে, মূর্তি পূজা, বোধিসত্ব অবধারণা নিয়ে, পালি এবং সংস্কৃতকে নিয়ে, বুদ্ধের পার্থিবতা অথবা অপার্থিবতা নিয়ে। 

কথিত হীনযান এবং মহাযানের মতভেদের প্রধান কারণ রয়েছে মূর্তি পূজায়। মতভেদের আরও কারণ রয়েছে, কিন্তু মূর্তিপূজা হল সেগুলির মধ্যে সর্বোপরি। ভগবানের মহাপরিনির্বাণের প্রায় পাঁচ শত বছর পরে মহাযানীরা বুদ্ধ মুর্তির সৃষ্টি করেছিল। মহাযানীদের মত ছিল এখন সময়ে এসেছে যে, কেবল অমূর্ত সিদ্ধান্ত দ্বারা লোকদেরকে ধর্মের প্রতি নিষ্ঠাবান রাখা যাবেনা। প্রতীকরূপে কিছু মূর্ত স্বরূপও দিতে হবে। এ অবধারণা হতে বুদ্ধ মূর্তির সৃজন হয়েছে। বুদ্ধের মূর্তি সমূহ নির্মাণ করার উৎকৃষ্ট কলাশাস্ত্রও তৈরী করা হয়েছে। এরূপ মূর্তিকলাই কালান্তরে গান্ধার এবং য়ুনানের কলার স্পর্শ পেয়েছে যা হতে মূর্তিকলার মথুরা শৈলীতে নতুন দিশা পাওয়া গিয়েছে। গান্ধার এবং মথুরা শৈলী মিশ্রিত হয়ে মূর্তিকলার এক নতুন যুগের জন্ম দিয়েছে। ধর্মের ক্ষেত্রে মূর্তি পূজার সবচেয়ে প্রথম আবিস্কার  বৌদ্ধরাই করেছে। পরবর্তীতে ইহাকে অন্য সম্প্রদায়েরাও আত্মসাৎ করেছে। থেরবাদীরা ইহাকে ভগবান বুদ্ধের মূল শিক্ষার বিপরীত বলে প্রবল বিরোধিতা করেছিল। পরিণাম স্বরূপ উভয়ের মধ্যে বিভাজন প্রকট হয়েছিল। আলাদা হওয়া বর্গেরা মূল থেরবাদীদেরকে ‘হীনযানী’ সম্বোধন করতে শুরু করেছে। 

ধর্মীয় ইতিহাসের পর্যবেক্ষণ, অবজারবেশনে ইহাও জ্ঞাত করায় যে, এক দীর্ঘ সময় অতিক্রমের পরে কোন উচ্চ প্রজ্ঞা সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব দ্বারা এ বিভাজিত মত সমূহের মধ্যে সমন্বয় স্থাপন করারও প্রবল প্রয়াস করতে রয়েছে। এ সমন্বয়ের প্রয়াস জৈনদের মধ্যে, খৃস্টানদের মধ্যে, ইসলাম, শিখ এবং বৌদ্ধদের মধ্যেও হয়েছে। হিন্দুদের মধ্যে শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব সম্প্রদায়কে সমন্বিত করার সবচেয়ে সফল প্রয়াস তুলসী দাসের রামচরিত মানসের দ্বারা হয়েছিল। অন্যথায় ষোড়শ’ শতাব্দীর পূর্ব পর্যন্ত শৈব এবং শাক্তের মধ্যে হিংস্র ও খুনাখুনি সংঘর্ষ চলমান ছিল। অযোধ্যার হনুমানগঢী কখনও শৈবদের কব্জায় থাকলে কখনও শাক্তদের কব্জায় চলে যেত। তুলসী দাস রামচরিত মানসে রামের দ্বারা শিবের পূজা করিয়েছেন, শক্তির উপাসনা করিয়েছেন, শৈব, শাক্ত ও বৈষ্ণব মত সমন্বিত হয়ে গিয়েছে। 

দর্শন শাস্ত্রে কোন মতকে প্রবন্ধ বা থিসিস বলা হয়ে থাকে। এক দীর্ঘ সময়ের পর যে কোন স্থাপিত দর্শন অথবা মত এক প্রতিক্রিয়াত্মক মত অথবা দর্শন অর্থাৎ বিরোধ প্রবন্ধের উদয় হয়ে থাকে। যাকে এন্টিথিসিস বলা হয়। আবার আরও দীর্ঘ অন্তরালের পর এ নব স্থাপিত প্রতিক্রিয়াত্মক দর্শন মত পরম্পরায়ও কিছু দোষ বা পরম্পরা এসে থাকে। আবার ইহাকে সংশোধনের জন্য কোন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি থিসিস বা এন্টিথিসিসকে সমন্বিত করে সিন্থেসিস করে থাকেন। যাতে উভয় মত বা দর্শন অথবা মত পুনঃ এক থিসিসের মত স্থাপন হয়ে যায়। আবার আরও দীর্ঘ সময়ের অন্তরালে সেখানেও পরম্পরা বা দোষ এসে যায়। আবার কোন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি সে থিসিসের এন্টিথিসিসের জন্ম দিয়ে থাকেন।এ প্রক্রিয়া অনবরত চলমান থাকে। যে দর্শন, মত, বিচারধারা, ব্যক্তি বা সমাজ এ প্রক্রিয়া  সতত চলমান থাকে, তা সবসময় সমীচীন, সাময়িক এবং প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকে। যেখানে এ প্রক্রিয়া থেমে থাকে, সে দর্শন, মত, বিচারধারা, ব্যক্তি বা সমাজ কালবাহী বা আউটডেট হয়ে যায়, মৃত হয়ে যায়। 

মহাপরিনির্বাণের পূর্বে ভগবান বুদ্ধ আনন্দ ভন্তেকে বলেছিলেন- ‘আনন্দ, আমার পরে ছোট ছোট বিনয় অনুশাসন আবশ্যকানুসারে পরিবর্তন করতে পারবে…..।

সে কথাই সঙ্গীতিতে যখন ভদন্ত আনন্দ স্থবির কর্তৃক জ্ঞাত করেছিলেন যে, ভগবান ক্ষুদ্রানুক্ষুদ্র শিক্ষাপদ সমূহ সময়ানুসারে পরিবর্তন করে নিতে নির্দেশ করেছেন। তখন ভদন্ত মহাকাশ্যপ বলেছিলেন-‘সে সমস্ত ক্ষুদ্রানুক্ষুদ্র শিক্ষাপদ সমূহ কি কি? ভদন্ত আনন্দ স্থবির বলেছিলেন-‘ভগবানের কাছ হতে তা তো আমি জিজ্ঞাসা করিনি।’ এ বিষয়ের জন্য ভদন্ত মহাকাশ্যপ ভদন্ত আনন্দকে ভৎর্সনা করলেন যে, এতই মহত্বপূর্ণ বিষয় কেন তিনি ভগবানের কাছ হতে জিজ্ঞাসা করেননি। 

এ প্রসঙ্গকে নিয়ে অনেক অনেক টীকা লিখা হয়েছে। ইহা গভীর দৃষ্টি দেওয়ার বিষয় যে, ভগবান স্বীয় ধর্মে কোন বিষয়ও অব্যাখ্যাত রেখে যাননি। তাহলে এ বিষয় অব্যাখ্যাত রেখে যাবেন কেন? ভদন্ত আনন্দকে ভগবানের কাছ হতে যে কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসার অনুমতি ছিল। তারপরেও এ বিষয়ে ভদন্ত আনন্দ বিস্তারভাবে ভগবানের কাছ হতে জিজ্ঞাসা করেননি কেন? ভগবান প্রমাদ বশত: এবিষয় সম্পূর্ণরূপে বলেননি এরকম তো হতে পারেনা, যা বুদ্ধ বলেছেন-‘ছোট ছোট বিনয়ের শিক্ষাপদ আবশ্যকানুসারে পরিবর্তন নেবে….’ সত্যিকারভাবে এতটুকু বলে ভগবান অনাগত সময় এবং সংঘকে স্বাধীনতা দিয়েছেন যে, তাঁরা আবশ্যকানুসারে যেন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। যদি পরিবর্তন যোগ্য বিনয়ের শিক্ষাপদও নির্দেশ দিয়ে যেতেন, তাহলে তাও পরম্পরাবাদী হয়ে যেত। 

ভগবানের এরূপ নির্দেশের ক্রিয়ান্বয়নের সবচেয়ে ভাল উদাহরণ আমরা চীনে দেখতে পাই। যখন বৌদ্ধধর্ম চীনে প্রবেশ করেছিল তখন সেখানকার সমাজে মুণ্ডিত মস্তক নিয়ে মান্যতা ইহাই ছিল যে, মুণ্ডিত মস্তক ব্যক্তি হল মাতা-পিতার প্রতি কৃতঘ্ন। তারা মাতা-পিতার সেবা করেনা। যারা মাতা-পিতার সেবা করতনা, মাতা-পিতার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকত না, তাদেরকে সমাজ ও শাসকের দ্বারা মস্তক মুণ্ডন করা হত। অর্থাৎ মুণ্ডিত মস্তক ছিল সামাজিক অপমানের প্রতীক এবং ভগবানের বিনয় অনুসারে ভিক্ষু-ভিক্ষুণীকে মুণ্ডিত মস্তক হওয়া ছিল অনিবার্য। তখন চীনের সামাজিক আবশ্যকতানুসারে সেখানে বিনয়ের সামান্য পরিবর্তন করা হয়েছে। ভিক্ষু দীক্ষার সময় চুল তো কেটেই থাকে, সাথে সাথে সেখানে মাথায় টুপিও পড়ানো হত। চীনা ভিক্ষুরা নিজেদের মুণ্ডিত মস্তকে টুপিও পড়ে থাকেন। ইহা সেখানকার বিনয় হয়ে গিয়েছে। ইহা ভগবান বুদ্ধ কর্তৃক প্রদত্ত আদেশের কারণেই হতে পেরেছে যে, আবশ্যকতানুসারে ভিক্ষুগণ ছোট ছোট বিনয়ের শিক্ষাপদ পরিবর্তন করে নিতে পারবে…।

বৌদ্ধধর্ম হল পৃথিবীর একমাত্র ধার্মিক বিচারধারা যা সবসময় অধ্যয়নে থাকতে হয়। এ কারণেই ইহা আজ সমগ্র পৃথিবীতে বিজ্ঞানের মত অধ্যয়ন এবং স্বীকৃত হচ্ছে। ইহা কোন দৈবিক ঘটনা নয় যে, পৃথিবীকে আজ প্রযুক্তিক বৈজ্ঞানিক শিক্ষা জাপান, কোরিয়া, চীন ইত্যাদি বৌদ্ধ দেশ সমূহ দিয়ে যাচ্ছে। 

বলার তাৎপর্য ইহাই যে, থিসিস, এন্টিথিসিস, সিন্থেসিসের প্রক্রিয়া বৌদ্ধধর্মে অবিরাম চলমান রয়েছে। এ কারণে নিজের প্রাচীনতার সাথেও ইহা সবসময় আধুনিক হয়ে থেকেছে।

বৌদ্ধদের মধ্যেও সমন্বয়ের প্রয়াস হয়েছে। বর্তমানে থেরবাদীদের এরকম একটি বিহারও দেখা যায়না, যেখানে ভগবান বুদ্ধের মূর্তি নাই, তাঁরা মহাযানীদের মূর্তি পূজার অবধারণাকে আত্মসাত করেছেন এবং মহাযানীদের দ্বারাও থেরবাদ হতে নিজেদের মতভেদ দূর করতে যথাসম্ভব প্রয়াস করা হয়েছে এবং করা হচ্ছে। বিগত প্রায় অর্ধ শতাব্দী হতে আমরা ইহা দেখতে পাচ্ছি যে, মহাযান, বজ্রযান, তন্ত্রযান নিকায় থেরবাদকে সম্বর্ধিত ও প্রমোট করা হচ্ছে। বিগত দু’ দশক হতে এ সমস্ত প্রয়াস আরও স্বার্থকরূপ নিতে শুরু করেছে। 

২০১৯ সালে শ্রাবস্তীতে মহাযানের কাগ্যু পরম্পরার এক বুদ্ধ বিহার নির্মাণ কার্য সম্পন্ন হয়েছে। ইহা বৌদ্ধ সাংস্কৃতিক মহাসভা, বৌদ্ধ মন্দির, শ্রাবস্তী নামে পরিচিত। লাদাখবাসী গুরু পরম পাবন দ্রিকুঙ্গ শাক্যবগান চেতসঙ্গ রিম্পোচে হলেন এ পরম্পরার আধ্যাত্মিক গুরু বা নায়ক। পরম পাবন দালাই লামা এবং পঞ্চেন লামার পর মহাযানী পরম্পরায় তিনি হলেন সর্বাধিক পূজনীয় এবং শ্রদ্ধেয় লামা। শ্রাবস্তীতে মহাযানী পরম্পরায় নির্মিত হওয়া বিহারের উদ্বোধন তিনি আন্তর্জাতিক থেরবাদী সঙ্ঘের দ্বারা করিয়েছেন। উদ্বোধনও কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং ভারত সহ প্রায় সমস্ত থেরবাদী দেশ সমূহ হতে তিনি ভিক্ষু সঙ্ঘকে আমন্ত্রণ করেছিলেন এবং নিজের নব নির্মিত বিহারে চারমাস বর্ষাবাস করিয়েছিলেন। চারমাস প্রবাসের সমস্ত খরচ স্বয়ংই বহন করেছেন। তাঁরা মহাযানী বিহারে চার মাস ব্যাপী কেবল থেরবাদী গ্রন্থ সমূহের পাঠ এবং ধর্মদেশনাই করেছিলেন। 

এ তো হল থেরবাদ-মহাযান সমন্বয়ের এক স্বার্থক উদাহরণ। দ্বিতীয় স্বার্থক উদাহরণ ইহাই যে, বিগত আঠার বছর যাবত বুদ্ধগয়ায় প্রতিবছর আয়োজিত আন্তর্জাতিক ত্রিপিটক সঙ্গায়নের আয়োজক মণ্ডলে মহাযানী উপাসক-উপাসিকা এবং ভিক্ষু-ভিক্ষুণীগণ নায়কের ভূমিকায় রয়েছে। মহাযানীদের খ্যাত্সে ফাউণ্ডেশনের বরিষ্টতম গুরু তারথং টুল্কু তথা তাঁর কন্যা ওয়াঙ্গমো ডিক্সী হলেন থেরবাদী ত্রিপিটক সঙ্গায়নের আয়োজিকা। বুদ্ধগয়ায় ত্রিপিটক সঙ্গায়ণে মহাযানী লামাগণও সম্পূর্ণ শ্রদ্ধায় পুরা দশদিন সঙ্গায়ণ করে থাকেন এবং সঙ্গায়ণের শেষে গৃধ্রকূট পর্বতে আয়োজিত একদিবসীয় মহাযানী ত্রিপিটক সঙ্গায়নে থেরবাদী ভিক্ষুগণও সম্পূর্ণ মৈত্রীর সাথে সম্মিলিত হয়ে থাকেন। ধর্ম যাত্রায়ও সমস্ত যানের ভিক্ষুগণ সহর্ষ সম্মিলন হয়ে থাকেন।

সত্যি বলতে গেলে, বর্তমান সময়ে থেরবাদীরা নিজেদের মৌলিক শুদ্ধতাকে বজায় রাখতে গিয়ে মহাযান হতেও কিছু তত্বকে আত্মাসাত করে নিয়েছে। বর্তমানে থেরবাদীদের এমন কোন বিহার নাই, যেখানে ভগবান বুদ্ধের মূর্তি নাই। থেরবাদী দেশ শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, মায়ানমার, লাওস, কম্বোডিয়াতেও বুদ্ধের বিশাল বিশাল মূর্তি রয়েছে। অনুরূপভাবে মহাযানীরাও থেরবাদের কতিপয় তত্বকে স্বীকার করে নিয়েছেলে। আমি এরকম লামাদেরকেও জানি, যাঁরা মহাযানী চীবর ত্যাগ করে থেরবাদী মতে পুণ: দীক্ষিত হয়েছেন এবং ইহার বিপরীতও রয়েছেন। সেরকম থেরবাদী ভিক্ষুণী সঙ্ঘও অনেক শক্তিশালী হয়ে আবার উত্থান হচ্ছে। অনেক মহাযানী ভিক্ষুণীরাও পুণ: থেরবাদ অনুসারে চীবর নিয়েছেন। 

সব মিলিয়ে তাৎপর্য ইহাই যে, কথিত থেরবাদ বা মহাযানের বিবাদ এবং ভেদভাব এখন মানানসই দেখা যাচ্ছেনা। পৃথিবী জানে যে, নোবেল পুরস্কার দ্বারা ভূষিত পরম পাবন দালাই লামা হলেন মহাযানী ধর্মগুরু। বৈশ্বিক স্তরে তিনি হলেন বৌদ্ধদের গৌরব। কিন্তু থেরবাদী অনেক কার্যক্রমে তিনি অতীব সম্মানের সাথে মুখ্য অতিথিরূপে আমন্ত্রিত হন এবং তিনিও থেরবাদী ভিক্ষুদিগকে উভয়হাত জোড় করে মস্তক ঝুঁকিয়ে নমন করে থাকেন। কেবল তা নয়, তিনিও অনেকবার থেরাবাদী কার্যক্রমের আয়োজন করে থাকেন এবং বুদ্ধগয়ায় আয়োজিত মহাযানী আয়োজন ‘কালচক্র পূজা’য় তিনি থেরবাদী ভিক্ষুদেরকেও আমন্ত্রণ করেন। 

নাগপুরে ধর্মদীক্ষার পর একবার সাংবাদিক বাবা সাহেব ড. ভীমরাও আম্বেদকরকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন-‘বৌদ্ধদের মধ্যে অনেক যান রয়েছে, আপনি কোন যানের শরণে গিয়েছেন?’

বাবা সাহেব দিশা নির্দেশক জবাবে বলেছিলেন-‘আমি বুদ্ধ যানের শরণে গিয়েছি।’

তিনি স্বীয় প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘বুদ্ধ এবং তাঁর ধম্ম’ বইয়ের সমাপন মহাযানী পরম্পরায় শপথ এবং প্রার্থনা দ্বারা করেছেন। 

‘বৌদ্ধ পূজা পাঠ’ পুস্তিকার সমাপন তিনি বোধিসত্ব অবলোকিতেশ্বরের মহাযানী মন্ত্র ‘ঔঁ মণি পদ্মে ওম’ দ্বারা করেছেন। পুণেতে দেহু রোডে ভগবান বুদ্ধের এক মূর্তির উদ্বোধন বাবা সাহেব লামাদের দ্বারা করিয়েছিলেন। জাপানের মহাযানী পরম্পরার প্রখর বিদ্বান ড. ডি. টি. সুজুকি বাবা সাহেবের বন্ধু ছিলেন। বাবা সাহেবের সাথে পরম পাবন দালাই লামার সাথেও নিকট ঘনিষ্টতা ছিল। শেষ নি:শ্বাসের মাত্র চার দিন পূর্বে ২রা ডিসেম্বর, ১৯৫৬ সালে পরম পাবন দালাই লামার নিমন্ত্রণে তাঁর সাথে বাবা সাহেব অসোক মিশন বুদ্ধ বিহার, মেহরলী, দিল্লিতে ছিলেন। সেখানে বাবা সাহেবকে তিনি বোধিসত্ব বলে সম্বোধন করেছিলেন। 

বৌদ্ধদের নিকায় হল একটি বৃক্ষের শাখা-প্রশাখার মত। শাখা-প্রশাখা সমূহ বৃক্ষকে বিশালতা দিয়ে থাকে। নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করেনা।

Comments

Popular Posts