20/03/2024
বুদ্ধ ও বৌদ্ধ ধম্ম সম্পর্কে বিশ্ব প্রসিদ্ধ বৈজ্ঞানিক আইনস্টাইনের অভিমত
ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু
বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিক আলবার্ট আইনস্টাইন (১৮৭৯-১৫৫) লিখেছেন যে-‘ বিশ্বের প্রথম বৈজ্ঞানিক হলেন বুদ্ধ।’
মহান বৈজ্ঞানিক আলবার্ট আইনস্টাইন ভগবান বুদ্ধকে পৃথিবীর প্রথম বৈজ্ঞানিক বলে স্বীকার করেছেন। তিনি আরও বলেছেন যে-‘ভবিষ্যতের বৌদ্ধধর্ম এক সার্বভৌমিক ধর্মই হবে। বৌদ্ধ ধর্ম ভৌতিক এবং আধ্যাত্মিক সম্বন্ধের ঐক্যতা আনায়নে যথার্থ ভূমিকা রাখবে। তখন মানুষ্যের ভগবান, ঈশ্বর, ধার্মিক কট্টরতা, ধর্মশাস্ত্র নিজের নিজের স্থানে সীমিত হয়ে যাবে।
বৌদ্ধ ধম্মে বিশ্বাসের স্থান নাই। ভগবান বুদ্ধ তাঁর প্রত্যেকটা বাক্যকে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মত খাঁটিত্ব প্রমাণ করে গ্রহণ করতে বলেছেন। যদি কোন ধর্ম আধুনিক বিজ্ঞানের অনুকুল হয়ে থাকে, তাহলে তা হবে একমাত্র বৌদ্ধ ধর্ম। বৌদ্ধ ধর্ম মনুষ্য এবং আধুনিক বিজ্ঞানের সমস্ত প্রয়োজন পূর্ণ করার শক্তি রাখে।’
আইনস্টাইন আরও বলেছেন যে-‘ বুদ্ধিজীবি ও বৈজ্ঞানিকদেরকে বুদ্ধ আকর্ষণ করে থাকেন।’
আলবার্ট আইনস্টাইন হোক অথবা হার্বাট জর্জ ওয়েল্স (১৮৬৬-১৯৪৬) বা হিইজটন স্মিথ (১৯১৯-২০১৬) অথবা বার্ট্রাণ্ড রাসেল (১৮৭২-১৯৭০) হোক পৃথিবীর এরকম কোন বিখ্যাত বুদ্ধিজীবি, বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক পাওয়া যাবেনা, যাঁরা ভগবান বুদ্ধ সম্পর্কে চিন্তা করেননি। ভগবান বুদ্ধ তাঁদের সবাইকেই আকর্ষণ করেছেন।
সমগ্র পৃথিবীর বুদ্ধিজীবি, বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক সহ সকল বিখ্যাত ব্যক্তিদেরকে বুদ্ধ চুম্বকের মত আকর্ষণ করেছেন। এমনকি পৃথিবীতে এমন অনেক বৈজ্ঞানিক রয়েছেন যাঁরা কোন ধর্মের প্রতি কোন আস্থা রাখেননা বা ধর্মের সাথে যুক্ত না থাকতেই পছন্দ করেন, সে সকল বৈজ্ঞানিকেরাও বুদ্ধ এবং বৌদ্ধ ধম্মের কিছু কিছু বিষয়ের প্রতি গভীর আসক্ত।
বিশ্ব বিখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন হলেন সে সকল হাতে গোণা বৈজ্ঞানিকদের মধ্যে একজন, যিনি স্বীয় সময়ের সমস্ত মহত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে আপন মতামত ব্যক্ত করেছেন। হয়তো জীবনের এরকম এমন কোন মহত্বপূর্ণ দিক নাই, যাতে আইনস্টাইন স্বীয় মৌলিক রায় দেননি।
ধর্ম হতে আচরণ পর্যন্ত, বিজ্ঞান হতে বিষয় বাসনা পর্যন্ত স্বীয় রায় প্রদানকারী বৈজ্ঞানিক আইনস্টাইন বুদ্ধ সম্পর্কে বিস্তৃতভাবে নিজের মত ব্যক্ত করেছেন। তিনি বৌদ্ধ ধম্মকে কেবল নিজের ধম্ম নয়, বরং সমগ্র পৃথিবীর মহান ধম্ম বলে স্বীকার করেছেন।
আইনস্টাইন পৃথিবীর সমস্ত ধর্ম, ধর্ম জনিত সমস্যা সমূহ এবং ধর্মের ভবিষ্যত সম্পর্কে চর্চা করেছেন। সেদিক থেকে তিনি বৌদ্ধ ধম্মের জ্যোতি সমগ্র বিশ্বব্যাপী ছড়ানোর আশা ব্যক্ত করেছেন। সেজন্য তিনি বৌদ্ধ ধর্মকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ধর্মরূপে চিহ্নিত করেছেন।
বৌদ্ধ ধম্ম সম্বন্ধে আইনস্টাইন ইউরোপের সে সকল মহান দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক এবং রাজনৈতিক নেতাদের কাতারে তালিকা ভূক্ত হয়েছেন, যাঁরা বুদ্ধের দ্বারা অনেক বেশী প্রভাবিত রয়েছেন। আইনস্টাইন বুদ্ধের সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন যে-‘আমি বুঝতে পেরেছি যে, বুদ্ধ হলেন এরকম একমাত্র ধর্ম প্রবর্তক, যিনি নিজের জ্ঞান ও জাগরুকতার মাধ্যমে তাহাই করেছেন, যা দুনিয়ার অন্যকোন ধর্ম প্রবর্তক করতে সাহস করেননি।’
ভগবান বুদ্ধের বুদ্ধত্ব জ্ঞান হল এরকম এক ধর্মের সারতত্ব, যা অনুশীলন করলেই পৃথিবীতে শান্তি স্থাপন হতে পারে। বৌদ্ধ ধর্ম ব্যতীত অন্যান্য সব ধর্ম উঁচু-নীচু, শ্বেত-কালো, ঈমান-বেঈমান ইত্যাদির কথা বলে থাকে।
আইনস্টাইন ইহাও বলেছেন যে, ইসা মসীহ বা যীশু খৃষ্টের গুরুও ছিলেন ভগবান বুদ্ধ। ইসা মসীহ কাশ্মীরে অবস্থান করে বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষা নিয়েছেন এবং ইউরোপে আসার পর ভগবানের পুত্র বলে পরিচয় দিয়েছেন।
আলবার্ট আইনস্টাইন সে সকল ইউরোপীয় বৈজ্ঞানিক এবং দার্শনিকদেরই সমতুল্য, যাঁরা খুব বেশী বুদ্ধের দিকে আকর্ষিত ছিলেন। বার্ট্রাণ্ড রাসেল বুদ্ধ সম্পর্কে বলেছেন-‘আমি যখন বুদ্ধ এবং বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে পড়েছি, তখন আমি ইহা জেনেছি যে, বৌদ্ধ ধর্ম পৃথিবীর একমাত্র ধর্ম হওয়ার সমর্থ রাখে। একদিন সমগ্র ইউরোপে ইহা প্রসারিত হবে এবং ইউরোপে একজনের চেয়ে আরেকজন বিচক্ষণ বৌদ্ধ বিচারক বা চিন্তাবিদ উৎপন্ন হবেন।’
মহান সাহিত্যিক এবং নাট্যকার জর্জ বার্ণাড শ’ (১৮৫৬-১৯৫০)ও বুদ্ধের দ্বারা খুব বেশী প্রভাবিত ছিলেন। তিনিও লিখেছেন যে-‘সমগ্র পৃথিবী একদিন বৌদ্ধ ধর্মকেই গ্রহণ করবে।’ তিনি আগে আরও লিখেছেন যে-‘যদি লোকেরা বুদ্ধের বাস্তবিক নামে তাঁর ধর্ম গ্রহণ নাও করেন, তবে অন্যকোন রূপক নামে হলেও বৌদ্ধ ধর্মকেই গ্রহণ করবে। পশ্চিমা দেশে একদিন এ ধর্ম গ্রহণ করতেই হবে। কেননা, লেখা-পড়া জানা বিদ্বানদের কেবল ইহাই এক ধর্ম হতে পারে।’
বুদ্ধ পৃথিবীর একমাত্র ধম্ম প্রবর্তক, যিনি সাধারণ লোকদের যত প্রভাবিত করে থাকেন, তার চেয়েও অনেকগুণ বেশী প্রভাবিত করেন পৃথিবীর বুদ্ধিজীবি, বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক ও উচ্চতর গবেষকদেরকে। ইহার সবচেয়ে বড় কারণ হল ইহাই যে, বুদ্ধ যে দর্শন উপহার দিয়েছেন, তা যেভাবে যেভাবে মনুষ্যের চেতনা জাগ্রত হয়ে থাকে, সেভাবে সেভাবে ইহাকে মহান হতে মহানতর অনুভব করতে থাকে।
ভগবান বুদ্ধ বলেছেন যে, অজ্ঞানতা হতে ভয় উৎপন্ন হয়, ভয় হতে অন্ধবিশ্বাস উৎপন্ন হয়, অন্ধবিশ্বাস হতে অন্ধভক্তি উৎপন্ন হয় এবং অন্ধভক্তি হতে মনুষ্যের বিবেক শূণ্য হয়ে যায়। যার বিবেক শূণ্য হয়, সে ব্যক্তি মানসিকরূপে গোলাম বা দাসত্ব বরণ করে নেয়।
এজন্য কোন কিছুর অন্ধভক্ত হওয়া উচিত নয়। প্রত্যেকটা বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা উচিত। বুদ্ধের বিচার হল এমন এক সিদ্ধান্ত, যা কখনও পুরাতন হয়না, তা সবসময় যুক্তিপ্রিয় লোকদেরকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে থাকে। ভগবান বুদ্ধ হলেন মানবতার ইতিহাসে মাইল ফলক।
Comments
Post a Comment