ক:05/04/2020

বিশেষত ধর্মান্ধরা লেখাটি অন্তত একবার পড়ে দেখুন-


ঈশ্বর মহান নয়


ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু


একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীতে যাঁদেরকে সবচেয়ে বেশী প্রতিভাশালী নাস্তিক বলে গণ্য করা হয় তাঁদের প্রথম দশজনের মধ্যে উপরের সারিতে রয়েছেন ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণকারী রিচার্ড ডকিন্স (Richard Dawkins, 1941-) যিনি ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করে ‘ The God Delusion’ শিরোনামে বই লিখে পৃথিবীতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। বইটি ২০০৬ সালে ইংল্যান্ড হতে প্রকাশিত হয়েছিল। এপর্যন্ত ইহার অনেক সংস্করণ বের হয়েছে। এরপর যাঁর নাম আলোচিত হয় তিনি হলেন আমেরিকায় জন্মগ্রহণকারী ক্রিস্টোফার হিচেন্স(Christopher Hitchens, (1949-2011)। তিনিও ‘God is not Great’ বা ঈশ্বর মহান নয় নামক শিরোনামে বই লিখে দুনিয়াতে হৈচৈ ফেলে দেন। তাঁর এ বিখ্যাত বইটি আমেরিকা হতে ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয়। এ বইতে তিনি হাজারো যুক্তি প্রমাণ দিয়ে বুঝাতে চেষ্টা করেছেন যে, বিগত ৫০০০ সাল হতে সমগ্র পৃথিবীতে মানব জাতির উপর যা কিছু ভয়ঙ্কর সঙ্কট এসেছে সে সঙ্কট সমূহে দুনিয়ার কোন ঈশ্বর, আল্লাহ, গড মানব জাতিকে কোন সহায়তা করেননি। মানব জাতির মধ্যে হাতে গোনা যে ৫% বুদ্ধিমান লোক ছিলেন তাঁরাই মানব জাতির সমস্ত সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে কোন না কোন রাস্তা বের করে বাঁচিয়েছেন বা বাঁচানোর প্রয়াস করেছেন।


কিন্তু ধর্মের নামে যাঁরা নিজেদের পেট পালন করছিলেন এবং করে যাচ্ছেন, যাঁরা নিজেরাই নিজেদেরকে ধর্মের ঠিকাদার ও ঈশ্বরের প্রতিনিধি মনে করেন তাঁরা মানব জাতির যে ৯৫% লোক রয়েছে এবং যাঁরা হচ্ছেন জন্মজাতই বুদ্ধিহীন ও কোন না কোন কাল্পনিক সহায়তা ছাড়া বাঁচতে পারেন না, সে রকম লোকদেরকে ধর্ম বার বার নিজের জালে ফাঁসিয়ে রেখেছে। দুর্ভাগ্যজনক যে, ক্রিষ্টোফার হিচেন্স আজ আমাদের মাঝে নাই, কিন্তু বর্তমানে বিশ্বে উৎপন্ন কোরোনা ভাইরাস আমাদেরকে আবারো ক্রিষ্টোফার হিচেনের সিদ্ধান্তই সত্য বলে প্রমাণ করে দিচ্ছে। এবং ইহাও সত্যতা প্রমাণ করছে যে, কোরোনা ভাইরাস প্রকৃতিই সৃষ্টি করেছে।তাই মানুষের সৃষ্টি করা আল্লাহ, ঈশ্বর, খোদা, গড কিছুই করতে পারবে না। যদি নিয়ন্ত্রন সম্ভব হয় সে নিয়ন্ত্রন আজ বিজ্ঞানই শুধু করতে পারে। 


সকল ধর্মের ঠিকাদারদের ইহাই প্রচলিত দাবী যে, ঈশ্বররই এ ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্তা। এবং তিনি সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ এবং সর্বত্র তিনি বিরাজমান, তিনি সব কিছু দেখে থাকেন এবং তাঁর হুকুম বা ইচ্ছা বা মর্জি বিনা গাছের একটি পাতা পর্যন্ত নড়ে না।


চীনের কম্যুনিষ্ট সরকার ধর্মীয় আবরণে সেখানকার লোকসংখ্যা গণনা না করায় বৌদ্ধরা পৃথিবীর জনসংখ্যায় পেছনে পড়ে রয়েছে। বৌদ্ধদের বাদ দিলে পৃথিবীতে সংখ্যাধিক্য লোক খৃস্টানই হয়। তাঁদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় গুরু ইটালীর রোম শহরে অবস্থান করে থাকেন। যাঁকে ভেটিকান সিটি বলা হয়। আজকাল কোরোনা ভাইরাসের ভয়ে ইটালীর সমস্ত চার্চ এবং ভেটিকান সিটি লক ডাউন (Lockdown) করা হয়েছে এবং খৃষ্টান জগতের সবচেয়ে বড় ধর্মগুরু পোপ সেখানে কোথাও চুপ করে বসে আছেন। এরপর যাঁদের নাম্বার আসে তাঁরা হলেন মুসলিম। সমগ্র পৃথিবীব্যাপী মুসলিমদের সবচেয়ে পবিত্র ভূমি এবং পবিত্র ধর্মস্থল হল মক্কার কাবা ঘর ও মদিনা শরীফ। সেখানেও সম্পূর্ণ রূপে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। দুনিয়াতে তৃতীয় স্থানে থাকা ভারতবর্ষে হিন্দুদের সমস্ত প্রসিদ্ধ মন্দির ও ধর্মস্থল অর্থাৎ চার ধাম, তিরুপতি বালাজী মন্দির, শির্ডি সাঁইবাবা মন্দির, জম্মুর বৈষ্ণুদেবী মন্দির ছাড়াও আরো অসংখ্য ছোটখাট মন্দির লক ডাউন করা আছে। দুনিয়াতে কোনও ধর্মে এবং কোন ভগবানের নিকট এতটুকু শক্তি নাই যে, এ কোরোনা ভাইরাসের মত এক মামুলি ভাইরাসকে বন্ধ করার। 


কোরোনা ভাইরাস আরও একবার প্রমাণ করে দিল যে, ঈশ্বর, গড, আল্লাহ এ সকল হল ধর্মগুরুদের ভাঁওতাবাজী, ঠকবাজী এবং অলীক কল্পনা মাত্র। ধর্মের ঠিকাদারেরই বুদ্ধিহীন লোকদের অজ্ঞান এবং ভয়ের ফায়দা উঠিয়ে তাঁদের শোষণ করার জন্য পৃথিবীতে বড় বড় ধর্মস্থল বানিয়ে রেখেছে। এবং হাজারো বছর পর্যন্ত সোজা-সরল জনসাধারণের অজ্ঞান এবং ভয়ের লাভ উঠিয়ে তাঁদের শোষণ করতে নিয়োজিত রয়েছেন। 


যখন হাজার লোক মুম্বই হতে শির্ডি পর্যন্ত খালি পায়ে হেঁটে আসে এবং সাঁই বাবার নিকট ভাল বউ, ভাল চাকরী, ভাল ছেলে-মেয়ে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে ভাল মুনাফা সহ না জানি আরো কত কিছু কামনা করে থাকেন এবং মনে করে থাকেন সাঁই বাবা সব মন কামনা পুরণ করে দেন। যদি সাঁই বাবা, বা বালাজী, বা বৈষ্ণোদেবী,বা আজমীর শরীফ, অথবা মক্কা-মদিনা বা ভেটিকান সিটি ভক্তদের এরকম ছোটখাট প্রার্থনা বা কামনা পুরণ করে দেন এবং মানব জাতির সবসময় সুখ ও কল্যাণ দেখে থাকেন, তাহলে আজ এ ঘোর সঙ্কটে সবাই কেন চুপ করে বসে আছেন? কোরোনার নিকট বেশী শক্তি, না আল্লাহ, ঈশ্বর, গডের নিকট? 


বিজ্ঞান বলে থাকে ১৪ বিলিয়ন বছর আগে বিগ বেংগের মাধ্যমে এ বিশ্বের নির্মাণ হয়েছে। এবং ইহারও প্রায় ৫ বিলিয়ন বছর পূর্বে পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে। এ পৃথিবীতে এখনও পর্যন্ত বিজ্ঞান ১৮ মিলিয়ন প্রজাতি চিহ্নিত করেছে। এবং মানব জাতি হল হোমোসোপিয়ন ১৮ মিলিয়ন প্রজাতির মধ্যে একটি। এবং এ বিশ্বের অগণিত বছরের ইতিহাসে মানব জাতির কোন নাম নিশানাও ছিল না। মানব জাতি বড় জোর পেছনের পাঁচ মিলিয়ন বছর হতে এ পৃথিবীতে এসেছে। এখনও পর্যন্ত অনেক প্রজাতি পৃথিবীতে এসেছে, কিছু বছর টিকেছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আবার বিলীনও হয়েছে। মানব জাতিও এ পৃথিবীতে  সবসময় টিকে থাকবে এর কোন ভরসা নাই। যেরকম ডাইনোসরাস এবং না জানি আরো কত প্রজাতি এসেছিল এবং চলেও গিয়েছে। এখানে মানব জাতিও হল এগুলির মধ্যে এক মামুলি প্রজাতি। 


এ বিশ্বকে চালানোর জন্য এক শক্তি আছে। বিজ্ঞানের ভাষায় ইহাকে Nature বা প্রকৃতি বলা হয়। এবং বিজ্ঞান ইহাও জানে যে, প্রকৃতি এক নিশ্চিত নিয়মের মধ্যে পৃথিবীকে চালায়। যদি এ প্রকৃতির উপরে কর্তৃত্ব পেতে হয় তাহলে আমাদের হাতে কেবল একটিই রাস্তা রয়েছে এবং তাহল এ প্রকৃতির রহস্যের নিয়ম সমূহের অনুসন্ধান, সংশোধন এবং প্রয়োগের মাধ্যমে জেনে নেওয়া। এখনও পর্যন্ত বিজ্ঞান প্রকৃতির অনেক প্রকার নিয়মের অনুসন্ধান করে জেনেছে এবং আরো জানার জন্য অনুসন্ধানের নিরন্তর প্রয়াস জারী রেখেছে। পৃথিবীর সমস্ত ধর্ম আমাদেরকে কেবল প্রকৃতির পূজা করার শিক্ষা দিয়ে আসছে, এবং এও বলছে যে, এভাবে পূজা করলে প্রকৃতি প্রসন্ন হবে এবং আমাদের প্রার্থনা ও কামনা পূর্ণ করবে। দুনিয়ার সকল ধর্মের এরকম মূলভূত শিক্ষাই হল মিথ্যা ও প্রতারণা মূলক। বিজ্ঞান এ কথা প্রমাণ করেছে যে, পূজা পাঠে প্রকৃতি নিজের স্বভাবকে বা নিয়মকে কখনও পরিবর্তন করে না। যদি প্রকৃতির উপর নিয়ন্ত্রন রাখতে হয় তাহলে এর একমাত্র রাস্তা হল প্রকৃতির নিয়ম সমূহকে জানা। এখনও পর্যন্ত পৃথিবীতে মানব জাতির সামনে যতই সমস্যা সমূহ এসেছে যেমন প্রাকৃতিক আপদ ও সমস্ত প্রকার সংক্রামক রোগ ব্যাধি সমূহ, কোনও ধর্ম বা কোনও ধর্মের ধর্মগুরুগণ বা ঈশ্বর, আল্লাহ, গড মানব জাতির এ রোগ সমূহের একটি রোগেরও কোন চিকিৎসা বা সমাধান দিতে বা করতে পারেনি। ইহা তো কেবল বিজ্ঞান যেরকম মেলেরিয়া, কলেরা, ইন্ফ্লুয়েন্জা, স্মল ফক্স। চিকেন ফক্স, এবং যাবতীয় রোগের ঔষধ সমূহের সন্ধান বিজ্ঞানই তো খুঁজেছে এবং উক্ত রোগ সমূহ সবসময়ের জন্য দূরী করণে সক্ষমও হয়েছে। কোরোনার উপরেও শীঘ্রই বিজ্ঞান চিকিৎসা অনুসন্ধানে সফলকাম হবে এ বিশ্বাস রয়েছে।


আজ পর্যন্ত মানব জাতির উপর যখন কোন বড় মুসিবত যখন এসেছে তখন সকল মানব সমাজ নিজেদের স্বীয় স্বীয় তীর্থ স্থানে গিয়ে নিজেদের বিশ্বাসের আল্লাহ, ঈশ্বর বা গডের সামনে ঝুঁকে পড়েছে বা পড়তে দেখেছি। কিন্তু কোরোনা ভাইরাস সে রাস্তাও বন্ধ করে দিয়েছে। হিন্দুদের সঙ্কট মোচন হনুমানও মন্দিরের দরজা বন্ধ করে বসে আছে। সমস্ত আপদ বালাই হতে রক্ষাকারী দেবী শীতলাও মন্দির বন্ধ করে শুয়ে আছে না জেগে আছে তার পাত্তাও নাই। সমস্ত পীর দরবেশদের কেরামতিও কোরোনা ভাইরাসের শক্তিতে অকেজো হয়ে মুখ থুবরে পড়ে আছে। যে কোন দুর্যোগ বালাই টেকেল দেওয়ার অপার শক্তির জীবন্ত উপগুপ্তের হদিসও নেই। কোন আকুতি মিনতি সংহারে তাঁদের কার্যকরী পদক্ষেপ কোথাও নাই। 


এখন সবার সামনে একটিই রাস্তা খোলা আছে আর তা হল বিজ্ঞান। সমস্ত ভগবান এবং তাঁদের প্রতিনিধি চুপ করে বসে আছেন। তাঁদের দরজাও বন্ধ। একটি রাস্তা ও দরজা কেবল খোলা আছে তা হল হাসপাতালের। এ হাসপাতাল আমাদের ভগবান দেননি। বিজ্ঞানই দিয়েছে। এজন্য কোরোনা ভাইরাস হতে কিছু শিক্ষা নিন। বিজ্ঞানবাদী হতে চেষ্টা করুন। অন্ধ বিশ্বাস ও অন্ধভক্তি হতে বের হোন। জাতি ধর্মের ও সম্প্রদায়ের আবরণ খুলে মানবতার আবরণ পরিধান করুন। এবং প্রকৃতি প্রেমী হোন। এবং প্রকৃতিকে প্রেম করতে, ভালবাসতে শিখুন। জীবে দয়া করুন। বর্তমান বিশ্বে এ সকল অন্ধ মূঢ় জনদের শিক্ষা দিতে বিজ্ঞানবাদী তথাগত বুদ্ধকে বিশেষ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। প্রকৃতি এবং প্রকৃতির প্রাণীদের গভীর ভালবাসতে আড়াই হাজার বছর পূর্বে বুদ্ধই বলেছিলেন।

Comments

Popular Posts